Monday, December 9, 2024

অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা।




अभिज्ञानशकुन्तमनुसृत्य अनसूया प्रियंवदा चेति चरित्रयोः सादृश्यं वैसादृश्यं च 

    উত্তরম্‌-- চরিত্রচিত্রণ নাটকের প্রাণস্বরূপ। প্রতিটি চরিত্র সৃষ্টির মূলে নাট্যকারের বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। সেই ব্যক্তিচরিত্রগুলি তাদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, হৃদয়বত্তা, সংবেদনশীলতায় বিশিষ্ট হয়েও নাটকের মূল উদ্দেশ্য সাধনে বিশেষ অবদান রেখে যায়। অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌ নাটকে এমনই দুটি চরিত্র--
অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা।

অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা চরিত্রের সাদৃশ্য—

    অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা শকুন্তলার অভিন্নহৃদয় সখী। শকুন্তলা ছাড়া তাদের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। তাঁকে কেন্দ্র করেই এই দু’জনের জীবন আবর্তিত। শকুন্তলার সুখ সম্পাদনে এরা সর্বতোভাবে সচেষ্ট। আশ্রমের গাছগুলিতে জলসেচন করা, লতাগুলির পরিচর্যা করার কাজে দু’জনেই শকুন্তলাকে সাহায্য করে। সরস হাস্য-পরিহাসে তারা শকুন্তলার সঙ্কোচ অনেকটাই দূর করে দিয়েছে। শকুন্তলার মানসিক উত্তরণে এরা দু’জন প্রধান অনুঘটকের কাজ করেছে। দুষ্যন্তকে দেখার পর তাঁকে পাওয়ার আশায় শকুন্তলার মানসিক পরিবর্তন দু’জনেই নিপুণভাবে পরযবেক্ষণ করেছে। একসময় শকুন্তলার অবস্থা অত্যধিক শোচনীয় হয়ে পড়লে তাঁকে বাঁচাতে নিভৃত লতাকুঞ্জে নায়ক-নায়িকাকে পরস্পর জানার, মনের কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে।

 

    শকুন্তলাকে বিবাহ করে দুষ্যন্ত রাজধানীতে ফিরে গেলে তারা উভয়েই চিন্তান্বিত হয় এবং শকুন্তলা যাতে সুখী হন, সেইজন্য তারা তাঁর সৌভাগ্যদেবতার পূজাও করে। শকুন্তলা স্বামীর চিন্তায় মগ্ন থাকার ফলে ঋষি দুর্বাসার দ্বারা কঠোরভাবে অভিশপ্ত হন। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা এতে অত্যধিক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং প্রিয়ংবদা অনেক অনুনয় করে শাপনিবৃত্তির একটা উপায়ও জেনে নেয়। তাদের সখীস্নেহ এত গভীর যে, শকুন্তলা যাতে কিছুতেই এই শাপের কথা জানতে না পারে, সেইজন্য দু’জনের মধ্যেই তা গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। শকুন্তলাকে রক্ষা করাই একমাত্র কর্তব্য বলে তারা মনে করে। শকুন্তলা যখন পতিগৃহে যাত্রা করেন তখন তাঁর বিচ্ছেদে দু’জনেই কাতর হয়ে পড়ে।

 

অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার চরিত্রের বৈসাদৃশ্য—

    অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার চরিত্রের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি তাদের চরিত্রে বৈপরীত্যও সমধিক প্রকটিত। প্রিয়ংবদা একটু হাসিখুশি, কিছুটা লঘু স্বভাবের এবং কোন কিছু গভীরভাবে চিন্তা করে না। অপরদিকে অনসূয়ার জীবনবোধ একটু গভীর, স্বভাবে ধীর-স্থির, সবকিছু যুক্তি দিয়ে বিচার করে।

    শকুন্তলাকে নিয়ে কৌতুক করা প্রিয়ংবদার খুবই প্রিয়। কেশরবৃক্ষের তলায় শকুন্তলা দাঁড়ালে প্রিয়ংবদা তাঁকে কৌতুক করে বলে-- ‘হলা শকুন্তলে, অত্র এব তাবৎ মুহূর্তকং তিষ্ঠ। যাবৎ ত্বয়া উপগতয়া লতাসনাথ ইব কেশরবৃক্ষকঃ প্রতিভাতি’।

    শকুন্তলা বনজ্যোৎস্নাকে একটু বেশী মাত্রায় দেখলে প্রিয়ংবদা তাঁকে বলে-- ‘যথা বনজ্যোৎস্না অনুরূপেণ পাদপেন সঙ্গতা অপি নাম অহমপি আত্মন অনুরূপং বরং লভেয় ইতি’।

    অনসূয়া একটু অন্যরকমের। তার শিষ্টাচারের জ্ঞান প্রবল। ভ্রমরবৃত্তান্তের মাধ্যমে দুষ্যন্ত তাদের সামনে উপস্থিত হলে শকুন্তলা সঙ্কোচে অবনতমুখী হন। অনসূয়া তাঁকে অতিথিসৎকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলে--  ‘হলা শকুন্তলে, গচ্ছ উটজম্‌। ফলমিশ্রম্‌ অর্ঘ্যম্‌ উপহর। ইদং পাদোদকং ভবিষ্যতি’।

    দুষ্যন্তকে দেখে শকুন্তলা মুখ নীচু করলে অনসূয়াই তাঁকে অতিথিসেবার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। অনসূয়ার স্বভাব কিছুটা অভিভাবক ধরণের। দুষ্যন্ত সবাইকে বসতে বললে অনসূয়া শকুন্তলার সঙ্কোচের কথা জেনেও ভদ্রতার খাতিরে অতিথির পাশে বসা উচিৎ বলে জানায়—‘হলা শকুন্তলে, উচিতং নঃ পর্যুপাসনম্‌ অতিথীনাম্‌। অত্র উপবিশামঃ’।

    রাজা দুষ্যন্ত সম্বন্ধে তিন জনেরই কৌতূহল থাকলেও অনসূয়াই তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করে এবং তপোবনে আগমনের কারণ জানতে চায়--  ‘কতমঃ আর্যেণ রাজর্ষিবংশঃ অলংক্রিয়তে, কতমঃ বা বিরহপর্যুৎসুকজনঃ কৃতঃ দেশঃ, কিং নিমিত্তং বা সুকুমারতরঃ অপি তপোবনপরিশ্রমস্য আত্মা পদম্‌ উপনীতঃ’?  অনসূয়ার ভেতরে সঙ্কোচও অনেক কম। সে নির্দ্বিধায় অপরিচিত রাজার কাছে শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত বলে।

 

    প্রিয়ংবদা লঘুস্বভাবের হলেও মানুষের মনোবৃত্তি বুঝতে পারে। শকুন্তলা সম্বন্ধে সেই প্রথম দুষ্যন্তের মনোভাব ধরতে পেরেছিল। শকুন্তলা দুষ্যন্তের জন্য অতিমাত্রায় কাতর হলে তাঁদের মিলন কি করে তাড়াতাড়ি অথচ গোপনে করা যায় এই বিষয়ে অনসূয়া সংশয় প্রকাশ করেছিল। প্রিয়ংবদা বলেছিল--‘নিভৃতমিতি চিন্তনীয়ম্‌, শীঘ্রমিতি সুকরম্‌’। অনসূয়া এই বিষয়ে একেবারেই অনভিজ্ঞ। প্রিয়ংবদা দুষ্যন্তের বিভিন্ন অবস্থার বর্ণনা দিয়ে অনসূয়াকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয়।

 

    শকুন্তলার প্রণয়-ব্যাপারে প্রিয়ংবদা একটু বেশী সক্রিয়। পদ্মপত্রে নিজের মনের কথা লিখে জানানোর জন্য সে শকুন্তলাকে পরামর্শ দেয়-- ‘তেন হি আত্মন উপন্যাসপূর্বকং চিন্তয় তাবৎ কিমপি ললিতপদবন্ধম্‌’। ‘এতস্মিন্‌ শুকোদরসুকুমারে নলিনীপত্রে নখৈঃ নিক্ষিপ্তবর্ণং কুরু’। শকুন্তলাকে সঙ্কটাপন্ন অবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য সে রাজার কাছে আবেদন জানায়--  ‘আপন্নস্য বিষয়নিবাসিনঃ জনস্য আর্তিহরেণ রাজ্ঞা ভবিতব্যম্‌ ইতি বঃ ধর্মঃ’। আবার, নায়ক-নায়িকাকে পরস্পরের কাছে মনের কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে অনসূয়াকে নিয়ে লতাকুঞ্জ থেকে সরে যায়।

 

    অপরদিকে অনসূয়া মনের তাৎক্ষণিক তৃপ্তির চেয়ে সমগ্র জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ী সুখের কথাই বেশী করে ভাবে। তাই দুষ্যন্তকে বলতে সে দ্বিধা করে নি--  ‘বয়স্য, বহুবল্লভা রাজানঃ শ্রূয়ন্তে। যথা নৌ প্রিয়সখী বন্ধুজনশোচনীয়া ন ভবতি তথা নিবর্তয়’। এই কথার উত্তরে দুষ্যন্ত শকুন্তলা সম্বন্ধে উচ্চ মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দেন--  

‘পরিগ্রহবহুত্বেঽপি দ্বে প্রতিষ্ঠে কুলস্য মে।

সমুদ্রবসনা চোর্বী সখী চ যুবয়োরিয়ম্‌’।।

 

    শকুন্তলার ব্যাপারে দুজনের ধারনা ভিন্ন ধরণের। অনসূয়ার চিন্তার কারণ--দুষ্যন্ত রাজধানীতে ফিরে গিয়ে অন্তঃপুরে বিলাস-ব্যসনে কাল যাপন করে শকুন্তলার কথা স্মরণ করতে পারবেন কি না। কিন্তু প্রিয়ংবদা এই বিষয়ে নিশ্চিন্ত দুষ্যন্তের গম্ভীর আকৃতি এবং মধুর ব্যবহারে সে খুবই প্রভাবিত। তার মতে--  ‘ন তাদৃশা আকৃতিবিশেষা গুণবিরোধিনো ভবন্তি’। কিন্তু তার চিন্তা অন্যখানে--  পিতা কণ্ব এই বিবাহ অনুমোদন করবেন কি না। অনসূয়া লোকচরিত্র সম্বন্ধে একটু বেশী অভিজ্ঞ। তার স্থির বিশ্বাস—পিতা কণ্ব মন থেকে এই বিবাহ অনুমোদন করবেন। কারণ সে জানে-- ‘গুণবতে কন্যা প্রতিপাদনীয়া ইত্যয়ং তাবৎ তাতস্য প্রথমঃ সঙ্কল্পঃ। তদ্‌ যদি দৈবমেব সম্পাদয়তি, ননু অপ্রয়াসেন কৃতার্থঃ গুরুজনঃ’।

 

    উপসংহার--  অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা শকুন্তলার প্রতি সমান স্নেহশীলা হলেও স্বভাবধর্মে অনেক ভিন্ন। শকুন্তলা-চরিত্রের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য এই দু’জনের অবদান অসামান্য। শকুন্তলা ছাড়া এদের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। আবার এই দু’জন ছাড়া শকুন্তলাও অপূর্ণ। আশ্রমের সহজ সরল বালিকা শকুন্তলাকে কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করাবার জন্য যে মানসিক প্রস্তুতি দরকার তা অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার মাধ্যমে করা হয়েছে। এখানেই চরিত্র দুটির সার্থকতা এবং কালিদাসও তাঁর উদ্দেশ্য সাধনে সফল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘কাব্যে উপেক্ষিতা’ প্রবন্ধে বলেছেন--  ‘একা শকুন্তলা শকুন্তলার এক তৃতীয়াংশ। শকুন্তলার অধিকাংশই অনসূয়া এবং প্রিয়ংবদা, শকুন্তলাই সর্বাপেক্ষা অল্প’। 

-----------------------


No comments:

Post a Comment