अभिज्ञानशकुन्तम् इति नाटके हंसपदिकायाः गीतस्य नाटकीय-तात्पर्यम्
উত্তরম্-- প্রতিটি নাটকে
একটা চূড়ান্ত পরিণতি থাকে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য মূল কাহিনীর সঙ্গে সামঞ্জস্য
রেখে নাট্যকারকে কিছু নতুন ঘটনা এবং চরিত্র সৃষ্টি করতে হয়। সেইসব ঘটনার
পরিপ্রেক্ষিতে চরিত্রগুলির পারস্পরিক সঙ্ঘাতও দেখাতে হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই
প্রতিটি ঘটনা ও চরিত্রসৃষ্টির পেছনে থাকে নাট্যকারের বিশেষ উদ্দেশ্য।
অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকে হংসপদিকার গানের মাধ্যমেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য সাধন করা
হয়েছে।
চতুর্থ অঙ্কের
শেষদিকে স্নেহপ্রবণ পিতা মহর্ষি কণ্বের কাছ থেকে যখন শকুন্তলার বিদায়দৃশ্য দেখি, তখন
রাজা দুষ্যন্ত এই আদুরে কন্যাকে কিভাবে গ্রহণ করবেন তা ভেবে আমাদের হৃদয় আশঙ্কায়
ভরে ওঠে। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার মতো আমরাও দুর্বাসার শাপের কার্যকারিতা বুঝতে পারি
না। বরং আংটি পেলে সমস্ত আশঙ্কার অবসান হবে –এইরকম একটা আশা মনে মনে পোষণ করি।
কিন্তু পঞ্চম অঙ্কের শুরুতেই সেই আশা নিদারুণভাবে আহত হয়। রাজার অন্তঃপুর থেকে
ভেসে আসে হংসপদিকার বেদনার্তি মেশানো একটি গান—
‘অভিনবমধুলোলুপস্ত্বং তথা পরিচুম্ব্য চূতমঞ্জরীম্।
কমলবসতিমাত্রনির্বৃতো মধুকর ! বিস্মৃতোঽস্যেনাং কথম্’।।
আমাদের বুঝতে
অসুবিধা হয় না শকুন্তলাকে উদ্দেশ্য করেই এই গানের অবতারণা। চূতমঞ্জরী হল যৌবনপূর্ণ
কমনীয়তা ও সৌন্দর্যের প্রতীক বনবিহারিণী শকুন্তলা এবং মধুকর হচ্ছেন রাজা দুষ্যন্ত
যার প্রধান কাজ হচ্ছে এক ফুল থেকে আর এক ফুলে মধু খাওয়ার মতো এক নারী থেকে অন্য
নারীতে সহজেই চলে যাওয়া। কমলবসতি হচ্ছে রাজার অন্তঃপুরে অবস্থান। তিনি অন্তঃপুরে
আসামাত্র কি করে শকুন্তলাকে ভুলে গেলেন –এটাই এই গানের অন্তর্নিহিত অর্থ।
দুষ্যন্ত অন্যভাবে গানের মানে বুঝেছেন। তিনি ভেবেছেন--রাণী বসুমতীর কাছে থাকার জন্য আরেক রাণী হংসপদিকা নিপুণভাবে তাঁকে তিরস্কার করছেন। এই তিরস্কারপ্রাপ্তি তাঁর জীবনে নিত্যনৈমিত্তিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমাদের মন বেদনাতুর হয়ে ওঠে যখন দেখি গান শুনেও দুষ্যন্তের ইষ্টজনের কথা মনে পড়ছে না। তিনি বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁর কথা ‘কিং নু গীতমাকর্ণ্য ইষ্টজনবিরহাদৃতেঽপি বলবদুৎকণ্ঠিতোঽস্মি’ আমাদের মনে ক্ষীণ আসা জাগিয়ে দিয়ে যায়।
হংসপদিকার গান
দুষ্যন্তের মনকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যা নাটকীয়তার দিক থেকে অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাজার এইরকম পর্যাকুল মানসিক অবস্থার
পরেই তিনি তপোবন থেকে আগত ঋষিকুমার শার্ঙ্গরব প্রমুখদের স্বাগত জানিয়েছেন। এরপর
শকুন্তলাকে রাজার ধর্মত্নীরূপে প্রমাণ করার জন্য ঋষিকুমারদের সঙ্গে বাদানুবাদে
রাজার মনে যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে তা অধিকতর সূক্ষ্ম এবং আকর্ষণীয়। দুষ্যন্তের
চরিত্র পঞ্চম অঙ্কের মতো আর কোথাও এত আকর্ষণীয় নয়। এর জন্য হংপদিকার গানের অবদান
সবচেয়ে বেশী। রাজা যখন গভীর ও অস্পষ্টভাবে ইষ্টজনের বিরহের কথা ভাবছেন, কিন্তু
মনে করতে পারছেন না ইষ্টজনটি কে, তখনই তাঁর সামনে শকুন্তলাকে
উপস্থিত করা হয়েছে। তখন মুহূর্তের জন্য আশা জাগে রাজা হয়তো তাঁকে চিনতে পারবেন।
কিন্তু শাপ ছিল অধিকতর বলবান্, তাই শকুন্তলার কথা তাঁর
মিথ্যা বলে মনে না হলেও তাঁকে চিনতে পারেন নি। পরস্ত্রী বলে তিনি শকুন্তলাকে
প্রত্যাখ্যান করলেন। এইরকম নাটকীয়তা সৃষ্টি করে ঘটনাপ্রবাহকে আকর্ষণীয় করার জন্য
হংসপদিকার গানের অবতারণা করা হয়েছে।
হংসপদিকার গানের মাধ্যমে দ্বিতীয় আর একটি উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে এবং তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় অঙ্কে দুষ্যন্ত শকুন্তলার সঙ্গে তাঁর গোপন প্রণয়ের কথা বিদূষকের কাছে স্বীকার করেছিলেন। পরে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন--এই ব্রাহ্মণ চটুল স্বভাবের, এখান থেকে ফিরে গিয়ে অন্তঃপুরে যদি তাঁর নতুন সম্পর্কের কথা বলে দেন, তাহলে অশান্তি হতে পারে। তাই পরে তিনি বিদূষকের রাজধানীতে প্রস্থানকালে তাঁর হাত ধরে বলেছিলেন—‘পরিহাসবিজল্পিতং সখে ! পরমার্থেন ন গৃহ্যতাং বচঃ’।
শকুন্তলা
সম্বন্ধে তিনি যা বলেছেন তা পরিহাসমাত্র, তাতে
সত্যতা বলে কিছু নেই। দুষ্যন্তের সামনে কণ্বশিষ্যদের সঙ্গে শকুন্তলার অবস্থানের
সময় বিদূষক যদি সেখানে উপস্থিত থাকতেন, তাহলে তিনি
দুষ্যন্তের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ তুলতে পারতেন এবং শকুন্তলার সঙ্গে রাজার
পূর্বপ্রণয়ের স্বীকারোক্তি প্রকাশ করে দিতে পারতেন। তাতে নাটকে অযথা জটিলতা সৃষ্টি
হত এবং নাটকটিকে সুষ্ঠু পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া সহজসাধ্য হত না। শুধু তাই নয়,
মিথ্যা প্রমাণিত হলে দুষ্যন্তের চরিত্রও কলঙ্কিত হত। এই জটিলতা
এড়ানোর জন্যই সুচতুরভাবে হংসপদিকার গানের অবতারণা করা হয়েছে।
গান শুনে
দুষ্যন্তের মনে হয়েছে—হংসপদিকা নিপুণভাবে তাঁকে তিরস্কার করেছেন—
‘নিপুণমুপালব্ধোঽস্মি’। উপযুক্ত
নাগরিকবৃত্তির দ্বারা হংসপদিকাকে শান্ত করার জন্য তিনি বিদূষককে অন্তঃপুরে পাঠিয়ে
দেন। যাওয়ার সময় বিদূষক বলে যান-- হংসপদিকার হাত থেকে তিনি সহজে নিস্তার পাবেন না-- ‘গৃহীতস্য তয়া
পরকীয়ৈঃ হস্তৈঃ শিখণ্ডকে তাড্যমানস্য অপ্সরসা বীতরাগস্যেব নাস্তি ইদানীং মে
মোক্ষঃ’। এতে বিদূষককে শুধু শকুন্তলার কথা শোনা থেকে বিরতই করা হল না, দীর্ঘক্ষণের
জন্য মূল দৃশ্যের বাইরেও রাখা হল যাতে কথাবার্তার মাঝখানে তাঁর আসার সম্ভাবনাই না
থাকে।
হংসপদিকার গান তৃতীয় আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। এতে দুষ্যন্তের প্রাত্যহিক স্বভাব প্রতিফলিত হয়েছে। এটা তাঁর অভ্যাস—মৌমাছির মতো এক ফুল থেকে আর এক ফুলে মধু খাওয়ার মতো এক নারী থেকে অন্য নারীতে চলে যাওয়া। হংসপদিকার গান শোনার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া‘সকৃৎকৃতপ্রণয়োঽয়ং জনঃ’ থেকে এটা স্পষ্ট। যদিও অবচেতনে শকুন্তলার স্মৃতি অস্পষ্টভাবে কাজ করার ফলেই তিনি উদ্বিগ্ন হয়েছেন, কিন্তু হংসপদিকার জন্য তাঁর অনুভূতি অনেকটাই শীতল। এইগুলি তাঁর জীবনের প্রাত্যহিক ঘটনা। কাজেই হংসপদিকার গান প্রমাণ করে যে, দুর্বাসার শাপের দ্বারা যা ঘটেছে তা বিচ্ছিন্ন কোন ব্যাপার নয়, দুষ্যন্তের স্বভাবের মধ্যেই তার বীজ নিহিত ছিল। এখানে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—‘কবি নিপুণ কৌশলে জানাইয়াছেন, দুর্বাসার শাপে যাহা ঘটাইয়াছে স্বভাবের মধ্যে তাহার বীজ ছিল। কাব্যের খাতিরে যাহা আকস্মিক করিয়া দেখানো হইয়াছে তাহা প্রাকৃতিক’।
উপসংহার=-- হংসপদিকার গান কালিদাসের অনন্যসাধারণ উদ্ভাবনী শক্তির এক অনবদ্য সৃষ্টি।
এর মাধ্যমে শকুন্তলার প্রত্যাখ্যানের ভূমিকা প্রস্তুত করে নাটকটিকে climax-এ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া
বিদূষককে দূরে সরিয়ে রেখে ঘটনার জটিলতা থেকে নাটকটিকে মুক্ত করা হয়েছে। এখানে
দুষ্যন্তের চরিত্রেরও কিঞ্চিৎ আভাস দেওয়া হয়েছে। তা না হলে স্মৃতি ফিরে পাওয়ার পর
দুষ্যন্তের চরিত্রের পরিবর্তন এবং সুস্থ মানবিক বোধে উত্তরণ ঠিকমতো বোঝা যেত না।
নাটকের যে মূল theme দেহগত প্রেমকে দেহাতীত এক
শাশ্বত মঙ্গলময় সৌন্দর্যলোকে উত্তীর্ণ করে দিয়ে একটা জীবনের সামগ্রিকতার পরিচয়
দেওয়া তাও সম্ভব হত না। অতএব সমগ্র নাটকের পরিপ্রেক্ষিতে হংসপদিকার গানের অবদান
অপরিসীম।
------
No comments:
Post a Comment