
KU,SEM-III,SEC-D
Kautilya’s Saptang Theory of
State
প্রাচীন ভারতের মৌর্যযুগ বিশ্বকে একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ উপহার দিয়েছে “অর্থশাস্ত্র”। এই গ্রন্থটির রচয়িতা মহামতি কৌটিল্য । অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটিতে কৌটিল্যের গভীরতম রাজনৈতিক জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায় । অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, যুদ্ধ-বিগ্রহ সহ প্রতিরোধ কৌশলের দক্ষতাকে প্রতিফলিত করার জন্য তাঁকে ইন্ডিয়ান ম্যাকিয়াভেলি(Indian
Machiavelli) নামে ডাকা হয় ।
রাজ্যের উৎপত্তি (Origin of State)
রাজ্যের উৎপত্তি হিসাবে নৈরাজ্যবাদকে আশ্রয় করে কৌটিল্য বলেন, দেশে যখন মাৎস্যন্যায় অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন প্রজাসকল মনুকে রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন । রাজ্যের প্রজারা মনুকে কর হিসাবে উৎপাদিত শস্যের এক -ষষ্ঠাংশ ,বাণিজ্যের লাভের এক-দশমাংশ এবং পশুবাণিজ্যের লাভের 50 ভাগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন ।
সপ্তাঙ্গ সিদ্ধান্ত/তত্ত্ব( Saptang Theory)
মহামতি কৌটিল্য রাজ্যের সাতটি অঙ্গের কথা বলেছেন-“স্বাম্যমাত্য-জনপদ-দুর্গ-কোশ-দণ্ড-মিত্রানি প্রকৃতয়ঃ” |রাজ্যের সপ্তাঙ্গ বিষয়ে কামান্দকীয় নীতিসারে বলা হয়েছে-
স্বাম্যমাত্যঞ্চ রাষ্ট্রং চ দুর্গং কোশো বলং সুহৃত্ |
পরস্পরোপকারীদং সপ্তাঙ্গং রাজ্যমুচ্যতে ||
রাজ্যের এই সাতটি অঙ্গকে কৌটিল্য শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সাথে তুলনা করেছেন । বর্তমানে রাজ্যের চারটি অঙ্গের বা লক্ষণের কথা বলা হয়ে থাকে । আচার্য কৌটিল্য বর্ণিত রাজ্যের অঙ্গগুলি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল-
রাজা বা স্বামী (The Ruler)
কৌটিল্যর মতে রাজাই হল রাজ্যের প্রধান এবং অভিন্ন অঙ্গ ।তাঁর মতে রাজা বা স্বামী দুই প্রকার-রাজা ও যুবরাজ |কৌটিল্য রাজাকে রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় বলে মনে করেন । কৌটিল্যের মতে রাজা দূরদর্শী,আত্মসংযমী,কুলীন,বৌদ্ধিক প্রভৃতি গুণযুক্ত -“মহাকুলীনো দৈব-বুদ্ধি-সত্ত্ব-সম্পন্নো বৃদ্ধদর্শী ধার্মিকঃ সত্যবাক্ অবিসংবাদক কৃতজ্ঞঃ স্থূললক্ষো মহোত্সাহো২দীর্ঘসূত্রঃ শক্যসামন্তো দৃঢবুদ্ধিঃ অক্ষুদ্রপরিসত্কো বিনয়কাম ইত্যাভিগামিকা গুণাঃ” ।রাজা হবেন কল্যাণকারী প্রজাহিতৈষী এবং প্রজাদের সামগ্রিক দেখভালের দায়িত্ব হবে রাজার | রাজা সর্বদা স্বকর্তব্যবিষয়ে সচেতন হবেন | কৌটিল্যের মতে রাজা রাজ্যের সর্বেসর্বা হলেও তিনি নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হবেন না |
অমাত্য বা মন্ত্রী (The Minister)
কৌটিল্যের মতে অমাত্য বা মন্ত্রী হলো রাজার চক্ষুস্বরূপ |রাজা এবং অমাত্য একই গাড়ির দুই চাকা | অমাত্য হিসাবে তাকে নির্বাচন করা উচিত যিনি কর্তব্যকর্ম সম্পাদনে দক্ষ,বাগ্মী ,প্রগল্ভ হবেন তথা রাজ্যের উন্নয়নমূলক কার্যে নির্ণায়ক ভূমিকা নেবেন | এবিষয়ে কামান্দকীয় নীতিসারে বলা হয়েছে-
“বৃদ্ধোপদেশসম্পন্নঃ শক্তোঃ মধুরদর্শনঃ |
গুণানুরাগী স্মিতবাগাত্মসম্পত্ প্রকীর্তিতা” ||
অমাত্যের মধ্যে দূরদর্শিতা একটি আবশ্যিক গুণ |
জনপদ(The Population)
জনপদ কথার অর্থ জনযুক্ত ভূমি । কৌটিল্য জনপদকে পায়ের সাথে তুলনা করেছেন । কৌটিল্য জনসংখ্যা তথা ভূভাগের দুটিকেই জনপদ বলে স্বীকার করেন ।কৌটিল্য জনপদের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় প্রসঙ্গে বলেছেন –জনপদের অভ্যন্তরে ও প্রান্তে দুর্গ নির্মাণের স্থান থাকবে,পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত থাকবে,আক্রান্ত হলে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন । মৎস্যপুরাণ ও বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণে বলা হয়েছে , রাজা এমন একটি দেশে বাস করবেন যেখানে জনসংখ্যার অধিকাংশ বৈশ্য ও শূদ্র , কিছু সংখ্যক ব্রাহ্মণ কিন্তু বেশিরভাগ হবে শ্রমজীবী মানুষ । কৌটিল্যের যুগে জনপদের ক্ষুদ্রতম অংশ ছিল ‘গ্রাম’। এই গ্রাম থেকে ক্রমানুসারে বৃহত্তর অংশগুলি হল-সংগ্রহণ,সার্বত্রিক, দ্রোণমুখ ও স্থানীয় ।
দুর্গ বা পুর (The Fortress)
মনুসংহিতায় ও মহাভারতের শান্তি পর্বে দুর্গ অর্থে ‘পুর’ শব্দটির প্রয়োগ করা হয়েছে । কৌটিল্য বাহু বা ভূজের সাথে দুর্গের তুলনা করে চার প্রকার দুর্গের কথা বলেছেন-
১. ঔদিক দুর্গঃ-যার চারিদিকে জল থাকে ।
২. পার্বত্য দুর্গঃ- যার চতুর্দিক পর্বত পরিবেষ্টিত থাকে ।
৩.ধান্বন দুর্গঃ-যার চারপাশে ঊষর জমে থাকে ।
৪.বন দুর্গঃ- যার চারিদিক বন পরিবেষ্টিত থাকে ।
রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দুর্গ অত্যাবশ্যকীয় উপাদান ।সেইজন্য আলতেকার বলেছেন-“Forts and armed forces were vitally necessary to defend the very existence
of the state and so are regarded as its essential constituents”.
কোশ (The Treasury)
কৌটিল্যের মতে কোন রাজ্যের সুখস্বরূপ কোশাগার সমৃদ্ধ হলেই কোন রাজ্য শক্তিশালী হতে পারে । যেহেতু এর সাহায্যে বিপুল সেনাবাহিনীর ভরণপোষণ সম্ভব। কৌটিল্য তাই বলেন- “কোশ মূলাঃ কোশপূর্বাঃ তস্মাৎপূর্ব কোশমবেক্ষত”। রাজা তার কোষাগার বৃদ্ধির জন্য প্রজাদের থেকে বিভিন্নভাবে রাজস্ব আদায় করেন । বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণে রাষ্ট্রকে বৃক্ষের সাথে তুলনা করে কোশাগারকে তাঁর মূল বা শিকড় রূপে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে । এককথায় কোশাগারের সমৃদ্ধির ওপরেই রাজ্যের সামগ্রিক শ্রীবৃদ্ধি নির্ভর করে ।
দন্ড বা সেনা(The Army)
কৌটিল্যের মতে দন্ড বা সেনা কোন রাজ্যের মনস্বরূপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ । তাঁর মতে সেনা চার প্রকারের- হস্তী সেনা , অশ্ব সেনা, রথ সেনা এবং পদাতিক সেনা । কৌটিল্যের মতে সেনা হবেন সাহসী,অপ্রতিরোধ্য, বলশালী , দেশপ্রেমিক।যদি কোন সেনা যুদ্ধে বীরগতি প্রাপ্ত হন তবে তার পরিবার যেন তার এই কাজে গর্বিত হয় ।সেনারা সর্বদা রাজার ইচ্ছেয় পরিচালিত হবে,রাজা নির্দেশিত কর্ম সম্পাদন করবে ।
মিত্র(Ally and Friend)
মিত্র হল কোন রাজ্যের কর্ণস্বরুপ ।মিত্র বলতে সাধারণ ভাবে সুহৃদের কথাই বলা হয়েছে । প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্র চিন্তায় মিত্রকে রাষ্ট্রের অন্যতম অপরিহার্য উপাদান হিসাবে গণ্য করা হয়েছে।অর্থশাস্ত্র অনুসারে মিত্র হবে বংশানুক্রমিক ,ও অকৃত্রিম । প্রয়োজনের সময় সাহায্য – সহযোগিতার জন্য যে প্রস্তুত থাকে এবং যার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার কোন আশঙ্কা থাকে না, সে হল মিত্র ।বিপরীতক্রমে যারা লোভী , অন্যায়ী, লম্পট ,ও দুষ্কৃতী , তারা হল শত্রু ।
উপসংহারঃ-
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক রাজনীতির পাঠ্যপুস্তক। রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের অবদান অপরিসীম। রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এই গ্রন্থটির গুরুত্ত্ব বর্তমান যুগেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
No comments:
Post a Comment