Monday, December 9, 2024

अभिज्ञानशकुन्तम् इति नाटके प्रकृतेः प्रभावः

अभिज्ञानशकुन्तम् इति नाटके प्रकृतेः यः प्रभावः दृष्टः सविमर्शं तदालोचयत

अथवा, प्रकृतेः कविरूपेण कालिदासस्य मूल्यायनं 

 

    উত্তরম্‌-- সংস্কৃত কাব্য ও নাটকে প্রকৃতি ব্যাপক পটভূমিকায় বিধৃত। এই ব্যাপারে কালিদাস সকলের অগ্রণী।তিনি মানুষের আন্তর প্রকৃতি ও বহিঃপ্রকৃতির সার্থক রূপকার। কালিদাস প্রকৃতিকে কোথাও আলম্বন বিভাবরূপে, কোথাও মানুষের অন্তর্নিহিত ভাবপ্রকাশে, কোথাও বা শুধুই চিত্রকল্পরূপে ব্যবহার করেছেন। কুমারসম্ভবে, রঘুবংশে, ঋতুসংহারে, মেঘদূতে, বিক্রমোর্বশীয়ে, অভিজ্ঞানশকুন্তলে সর্বত্রই কবিপ্রতিভার স্পর্শে প্রকৃতি সঞ্জীবিত হয়ে উঠেছে।

    ঋতুসংহারকাব্যে গ্রীষ্ম প্রভৃতি ছয় ঋতুর আবর্তনে প্রকৃতিরাজ্যে পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দেহে-মনে কেমন পরিবর্তন হয়, তা অপূর্ব চিত্রধর্মিতা ও গীতিধর্মিতায় কবি ব্যক্ত করেছেন। এখানে প্রকৃতি আলম্বন ও উদ্দীপন বিভাব হিসাবে কাজ করেছে।

    মেঘদূতকাব্যে নদ-নদী-গিরি-নগরী এক একটি জীবন্ত চিত্ররূপে উপস্থিত হয়েছে। পূর্বমেঘে মেঘের গমনপথে প্রকৃতি বিচিত্ররূপে অঙ্কিত হয়েছে। সেখানে বিন্ধ্যপাদে বিশীর্ণা রেবানদী, চঞ্চল তরঙ্গায়িত বেত্রবতী, কদম্বপুষ্পে শোভিত নীচৈগিরি, বেণীভূত প্রতনুসলিলা সিন্ধু, মানসসরোবর, অমরকূট পর্বত প্রভৃতি চিত্রগুলি অনবদ্য। উত্তরমেঘে যক্ষবধূর এক একটি অবস্থা প্রকৃতির একটি একটি অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে কালিদাস বর্ণনা করেছেন।

    কুমারসম্ভবম্‌ কাব্যে হিমালয় একটি চরিত্ররূপে চিত্রিত হয়েছে। কবি শ্লোকে শ্লোকে সু-উচ্চ হিমালয়ের মহিমা বর্ণনা করেছেন। এখানে অকাল বসন্তের বর্ণনা চমৎকার।

    বিক্রমোর্বশীয়ম্‌ নাটকে উর্বশী লতায় পরিণত হয়েছেন। তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে পুরূরবা উন্মাদপ্রায় হয়ে যান। সমস্ত প্রকৃতি তাঁর চেতনার রঙে রঞ্জিত হয়েছে।

    রঘুবংশকাব্যে উত্তাল সমুদ্র, সজীব বনরাজির দৃশ্য, সীতাকে নির্বাসন দিতে আগত লক্ষ্মণকে তরঙ্গিত গঙ্গাপ্রবাহের নিষেধ, নির্বাসিতা সীতার দুঃখে প্রকৃতির কাতরতা প্রভৃতি বর্ণনায় কালিদাস প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছে

    অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌ নাটকে প্রকৃতিচিত্রণ সমগ্রতা লাভ করেছে। প্রস্তাবনা অংশে গ্রীষ্মকালের বর্ণনায় বিলাসিনীগণ ভ্রমর-চুম্বিত শিরীষকুসুমকে কর্ণভূষণ করেছে।

    প্রথম অঙ্কে মালিনীতীরবর্তী মহর্ষি কণ্বের আশ্রম। শুকপাখিদের কোটর থেকে চ্যুত নীবার ধানের কণা পড়ে আছে। এখানে মানুষ ও প্রকৃতির নিবিড় আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। এখানে হরিণেরা নির্ভয়ে বিচরণ করে। তরুলতা সোদরস্নেহে লালিত। এখানে অনসূয়া, প্রিয়ংবদা ও বনজ্যোৎস্নাকে আলাদা করা যায় না। সহকার (আম) তরুর সঙ্গে বনজ্যোৎস্নার মিলন সকলকে আনন্দ দেয়।

    দ্বিতীয় অঙ্কে প্রকৃতির নৈর্ব্যক্তিক ছবি। এখানে গ্রীষ্মকালে মহিষের জলে অবগাহন, নির্ভয়ে মৃগকুলের রোমন্থন, জলশয়ে শূকরদের মুস্তাঘাস উৎপাটন বর্ণিত হয়েছে।

    তৃতীয় অঙ্কে প্রকৃতি উদ্দীপন বিভাবরূপে কাজ করেছে। মালিনীতীরের নিভৃত বেতসকুঞ্জ, পদ্মগন্ধে সুরভিত বনবায়ু বিরহসন্তপ্ত নরনারীর হৃদয়াবেগকে উদ্দীপিত করে।

    চতুর্থ অঙ্কে মানুষ ও প্রকৃতির নিবিড় বন্ধন সকলকেই আপ্লুত করে। তপোবনভূমিতে আজন্ম লালিত শকুন্তলা পতিগৃহে যাবেন। বনদেবতারা শকুন্তলাকে অলঙ্করণের জন্য দিয়েছেন ক্ষৌমযুগল, নানারকম অলঙ্কার এবং পা রাঙানোর জন্য লাক্ষারস। বনপ্রকৃতির সঙ্গে শকুন্তলার সম্পর্ক অচ্ছেদ্য।আশ্রমের গাছগুলিতে জল না দিয়ে শকুন্তলা কখনো জলপান করতেন না, সাজলে ভালবাসলেও স্নেহবশতঃ কখনো তিনি একটি পাতাও ছিঁড়তেন না, গাছগুলিতে প্রথম ফুল ফোটার সময়ে তাঁর আনন্দের সীমা থাকত না, সেই শকুন্তলা আজ পতিগৃহে যাবেন। মহর্ষি কণ্ব সকল আশ্রমতরুর কাছে শকুন্তলার গমনের অনুমতি চাইলেন। হঠাৎ একটি কোকিল ডেকে উঠল। কণ্ব বললেন— ‘অনুমতগমনা শকুন্তলা তরুভিরিয়ং বনবাসবন্ধুভিঃ’। বৃক্ষলতা যেন কোকিলরবের দ্বারা শকুন্তলাকে গমনের অনুমতি দিল।

    শকুন্তলা স্বামির সঙ্গে মিলনের চিন্তায় ব্যাকুল, কিন্তু তপোবন ছেড়ে যেতে তাঁর মন চাইছে না। শকুন্তলার বিরহে তপোবনেরও একই অবস্থা—

‘উদ্গলিতদর্ভকবলা মৃগাঃ পরিত্যক্তনর্তনময়ূরাঃ’।

অপসৃতপাণ্ডুপত্রা মুঞ্চন্ত্যশ্রুণীব লতাঃ’।।

    শকুন্তলা বনজ্যোৎস্নার কাছ থেকে বিদায় নিতে যান। কণ্ব বলেন— ‘অবৈমি তে তস্যাং সোদর্যস্নেহম্‌’।শকুন্তলা এগিয়ে চলেন। একটি হরিণশিশু শকুন্তলার আঁচল টেনে ধরে। এই হরিণশিশুটিকে শকুন্তলা নিজের হাতে বড় করেছেন। এর কথা ভেবে শকুন্তলার চোখ জলে ভরে যায়। শকুন্তলা চলে যাবার পর অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা বলেন—‘শকুন্তলাবিরহিতং শূন্যমিব তপোবনং প্রবিশাবঃ’।

    পঞ্চম অঙ্কেও প্রকৃতির প্রসঙ্গ এসেছে শকুন্তলাকে বর্ণনা করতে গিয়ে কবি বলেছেন

মধ্যে তপোধনানাং কিসলয়মিব পাণ্ডুপত্রাণাম্‌’, ‘অন্তস্তুষারং কুন্দমিব ইত্যাদি

    ষষ্ঠ অঙ্কে প্রকৃতি অনুশোচনাগ্রস্ত দুষ্যন্তের হৃদ্দয়চ্ছবি

চূতানাং চিরনির্গতাপি কলিকা বধ্নাতি ন স্বং রজঃ

সন্নদ্ধং যদপি স্থিতং কুরবকং তং কোরকাবস্থয়া।

কণ্ঠেষু স্খলিতং গতেঽপি শিশিরে পুস্কোকিলানাং রুতং

শঙ্কে সংহরতি স্মরোঽপি চকিতস্তূর্ণাকৃষ্টং শরম্‌’।।

বসন্ত এসেছে, কিন্তু আমের মুকুলে পরাগ আসে নি। কুরবক কুঁড়ি হয়েই আছে, কোকিলের কণ্ঠ স্খলিত হচ্ছে।

    সপ্তম অঙ্কে আকাশপথে দুষ্যন্তের  স্বর্গে গমনকালে প্রবহবায়ুর স্তর, মেঘমালা, মহর্ষি মারীচের আশ্রম, হেমকূট পর্বত, সিংহশিশুর সঙ্গে সর্বদমনের খেলা প্রভৃতিতেও কালিদাসের প্রকৃতিপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়।

    অতএব দেখা যাচ্ছে—কালিদাসের সমগ্র সৃষ্টিতে প্রকৃতি বিশাল ভূমিকা পাল করেছে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এমন অন্তরঙ্গ সম্পর্ক বিশ্বসাহিত্যের আর কোথাও দেখা যায় না। প্রকৃতি কালিদাসের কাব্যে একটি জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শকুন্তলা’ প্রবন্ধে যথার্থই বলেছেন—

‘অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটকে অনসূয়া-প্রিয়ংবদা যেমন, দুষ্যন্ত যেমন, তপোবনপ্রকৃতিও তেমনি একজন বিশেষ পাত্র।--প্রকৃতিকে মানুষ করিয়া তুলিয়া তাহার মুখে কথাবার্তা বসাইয়া রূপকনাট্য রচিত হইতে পারে, কিন্তু প্রকৃতিকে প্রকৃত রাখিয়া, তাহাকে এমন সজীব, এমন প্রত্যক্ষ, এমন ব্যাপক, এমন অন্তরঙ্গ করিয়া তোলা, তাহার দ্বারা নাটকের এত কার্য সাধন করাইয়া লওয়া, এতো অন্যত্র দেখি নাই’।

বলেন্দ্রনাথ বলেছেন--‘শকুন্তলায় এই প্রকৃতি নাটকের মেরুদণ্ড।–এই প্রকৃতি হইতে বিচ্ছিন্ন করিলে শকুন্তলার কিছুই অবশিষ্ট থাকে না’।

Dr. S. N. Dasgupta এবং S. K. De বলেছেন-- ‘We find that the whole nature is a replica of the human world—the same feelings and emotions, the same passions and sorrows, the same feelings of tenderness, love, affection and friendship that are found to reign in the human mind, are also revealed in the same manner for Kālidāsa in and through all the objects of Nature.’

 

No comments:

Post a Comment