SANS-H-CC-T-03
‘Bana’s prose is an Indian wood’
—सविमर्शमालोच्यताम्।
উত্তর—
সংস্কৃত সাহিত্যের আকাশে বাণভট্ট মধ্যহংস স্বরূপ বিরাজ করলেও তাঁর রচনার বাহ্যিক কাঠিন্য, দীর্ঘ বর্ণনা, দীর্ঘ সমাস, গৌণ কাহিনীর দ্বারা মুখ্য কাহিনীর বাধাপ্রাপ্ত হওয়া- প্রভৃতি বিষয়গুলিকে সমালোচকগণ ত্রুটি হিসেবে তুলে ধরেছেন । এই বিষয়ে পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিত Weber বলেছেন— ‘Bana’s prose is an Indian wood where progress is rendered impossible by the undergrowth until the traveller cuts out a path for himself and when, even then, he has to reckon with malicious wild beasts in the shape of unknown words that affright him.’
বাণের রচনার ত্রুটি—
আড়ম্বরবহুল রচনাশৈলী—
বাণের রচনা আড়ম্বরবহুল। দীর্ঘবাক্য প্রয়োগ, জটিল বাক্যবিন্যাস, অনুপ্রাস, যমক এবং কঠিন শ্লেষের প্রাধান্য থাকায় বাণের বাগাড়ম্বর অনেক বেশী । যেমন—বিদিশা নগরীর বর্ণনা—
‘জলাবগাহনাবতাড়িত-জয়কুঞ্জর-কুম্ভসিন্দুর-সন্ধ্যায়মান-সলিলয়োন্মদ-কলহংস-কোলাহল-মুখরিত-কুলয়া’ — ইত্যাদি।
অর্থ উপলব্ধির অন্তরায়—
বাণভট্ট যথেচ্ছ বিশেষণ প্রয়োগে কাব্যকে অযথা ভারাক্রান্ত করে তুলেছেন। ফলে তা অর্থ উপলব্ধির অন্তরায় হয়েছে। যেমন—কাদম্বরীতে রাজা শূদ্রকের বর্ণনায় ‘আসীত্’ ক্রিয়াপদ দিয়ে শুরু করে শেষ করেছেন ‘রাজা শূদ্রকঃ’ দিয়ে । মাঝখানে ২৭ লাইন, একটাই বাক্য । বিন্ধ্যাটবীর বর্ণনায় ‘অস্তি’ দিয়ে শুরু করে ‘বিন্ধ্যাটবী’ বলে শেষ করেছেন। মাঝখানে ৪৯ লাইন, একটাই বাক্য। বর্ণনীয় বিষয়ের মাহাত্ম্য অনুসারে বিশেষণের পর বিশেষণ সাজিয়েছেন। কষ্টসাধ্য অন্বয়ের ফলে অনেক ক্ষেত্রে অর্থবোধের ব্যাঘাত ঘটেছে।
দীর্ঘ সমাস ও সন্ধির প্রয়োগে দুরূহতা—
কবি বাণভট্ট দীর্ঘ সমাস ও সন্ধির প্রয়োগে, অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহারে এবং মাঝে মাঝে বিভিন্ন আখ্যানাদির সন্নিবেশে কাব্যকে দুরূহ করে তুলেছেন। ফলে সাধারণ পাঠক কাব্যের রসাস্বাদন থেকে বঞ্চিত হন।
মাত্রাজ্ঞানের অভাব—
বাণ যখন যা বর্ণনা করেছেন তখন তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করেছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। মূল কাহিনীর বিস্তার এত বেশী হয়েছে যে, মূল কাহিনীই কোন কোন ক্ষেত্রে গৌণ হয়ে গেছে।Weber উক্ত বৈশিষ্ট্যগুলিকেই লক্ষ্য করে বলেছেন-- ‘Bana’s prose is an Indian wood’.
কাদম্বরীর সমাসবহুল জটিল বাক্যবিন্যাস সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন— ‘মেদস্ফীত বিলাসিনীর ন্যায় তাহার সমাসবহুল বিপুলায়তন দেখিয়া সহজেই বোধ হয় সর্বদা চলাফেরার জন্য সে হয় নাই,বড়ো বড়ো টীকাকার ভাষ্যকার পণ্ডিত বাহকগণ তাহাকে কাঁধে করিয়া না চলিলে তাহার চলা অসাধ্য ।‘
Dr. S. K. De এবং Dr. Dasgupta বলেছেন-- ‘Bana’s style and diction suffer from the vices of an unduly laboured vocabulary, syntax and ornamentation. His prose has been compared to an Indian jungle.’
Weber-এর মতের মূল্যায়ন—
Weber-এর মত সর্বাংশে সত্য নয়, কোন কোন ক্ষেত্রে সত্য। তিনি কাদম্বরী কাব্যকে দুষ্প্রবেশ্য ভারতীয় অরণ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সমাস, সন্ধি, অপ্রচলিত শব্দের প্রয়োগ দেখে তিনি ভীত হয়েছেন। কাদম্বরীর রস আস্বাদন করতে না পেরেই তিনি সম্ভবতঃ এইরকম বিরূপ মন্তব্য করেছেন।
কাব্য বা কবিতা সকলের জন্য নয়। ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’ এটা যেমন সত্য, তেমনি‘সকলেই কাব্যের অধিকারী নয়’—এটাও সমানভাবেই সত্য । এর জন্য নিয়মিত কাব্যানুশীলনের অভ্যাস করতে হয়। রাজা শূদ্রক, চণ্ডালকন্যা, বিন্ধ্যাটবী, পম্পা সরোবর ইত্যাদি বর্ণনায় বাণ দীর্ঘসমাস, সন্ধি, বিবিধ অলঙ্কারের প্রয়োগ করেছেন ঠিকই, কিন্তু তার বাইরেও প্রসাদগুণ সম্পন্ন বাক্যও প্রচুর আছে।
বাণের কাব্যের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য—
ভাব অনুসারে ভাষার প্রয়োগ—
বাণ ভাব ও ভাষার মধ্যে অপূর্ব সামঞ্জস্যবিধান করেছেন। চণ্ডালকন্যার মর্ত্যলোক-দুর্লভ সৌন্দর্য, বিন্ধ্যাটবীর স্নিগ্ধ-কোমল সৌন্দর্য ও মৃত্যুর বিভীষিকা বিমূর্ত উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও দীর্ঘ সমাসবহুল বাক্যে বিবৃত হয়েছে। এইরকম শাল্মলী তরু, মুনিকুমার হারীত, শবর সেনাপতি প্রভৃতি সমস্ত বর্ণনাতেই বিষয় অনুসারে ভাষার প্রয়োগ করা হয়েছে।
বাণ যখন মানুষের হৃদয়বৃত্তির কথা বলেছেন, তখন সেই সেই ভাবাশ্রয়ী ভাষাও ব্যবহার করেছেন। যেমন—হর্ষচরিতের প্রথম উচ্ছ্বাসে ঋষি দুর্বাসাকে ব্রহ্মার উপদেশ ও তিরস্কার, পঞ্চম উচ্ছ্বাসে প্রভাকরবর্ধন কর্তৃক হর্ষকে সান্ত্বনাদান, কাদম্বরীতে পুণ্ডরীকের মৃত্যুতে কপিঞ্জলের আর্তনাদ, মহাশ্বেতার বিলাপ, চন্দ্রাপীড়কে শুকনাসের উপদেশ প্রভৃতি ছোট ছোট বাক্যে সমাপ্ত হয়েছে । রাজলক্ষ্মীর নিষ্ঠুর স্বভাব সম্বন্ধে শুকনাস বলেছেন— ‘ন পরিচয়ং রক্ষতি, নাভিজনমীক্ষতে, ন রূপমালোকয়তে। ন কুলক্রমমনুবর্ততে, ন শীলং পশ্যতি, ন বৈদ্গ্ধ্যং গণয়তি, ন শ্রুতমাকর্ণয়তি। ধর্মনুরুধ্যতে, ন ত্যাগমাদ্রিয়তে, ন বিশেষজ্ঞতাং বিচারয়তি ।'
আন্তরবস্তুর বিশ্লেষণ—
বাণ মানুষের অন্তর্নিহিত সূক্ষ্ম, কোমল ও সংবেদনশীল আবেগ-অনুভূতি সুদক্ষ মনস্তাত্ত্বিকের মতো তুলে ধরেছেন । যেমন—পিতার মৃত্যুর পর শুকশাবকের মানসিক অবস্থা— ‘নাস্তি জীবিতাদন্যদভিমততরমিহ জগতি সর্বজন্তূনাম্ । ধিঙ্ মামকরুণমতিনিষ্ঠুরম্’ ।সন্তানহীন পিতা তারাপীড়ের মানসিক অবস্থা, মহাশ্বেতার হৃদয়ের তন্ময়তা, আত্মনিবেদন প্রভৃতি তাদের আত্মবিশ্লেষণে যথাযথভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রথাবহির্ভূত উপমা-প্রয়োগ—
বাণ প্রথাবহির্ভূত উপমা-প্রয়োগে একেবারে আধুনিক । যেমন—কাদম্বরীতে প্রভাককালের চাঁদ—‘কমলিনী-মধুরক্ত-পক্ষসম্পূটে বৃদ্ধহংস ইব—চন্দ্রমসি ।‘
অস্তগামী সূর্য—‘পারাবত-পাদ-পাটলরাগো রবিঃ’--পায়রার পায়ের মতো রক্তিম সূর্য । ইন্দ্রিয়াসক্তরাজাদের স্বভাব—‘কুলীরা ইব তির্যক্ পরিভ্রমন্তি’ –কাঁকড়ার মতো তির্যকভাবে চলেন।অপরাহ্ণকালের রোদ—‘বালবাসস্যারুণ অপরাহ্ণতাপে’-বাচ্চা কাকের মুখের মতো অরুণবর্ণ ।
সন্ধ্যার অন্ধকার—‘পরিণমত্ তালফলত্বিট্’--পাকছে এমন তালফলের মতো কালচে বাদামি ।
এইরকম আরও অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে ।বাণ কোথাও কোথাও বিশেষণ প্রয়োগে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন।
উপসংহার—
বাণের দীর্ঘ বিস্তারিত বর্ণনা, ওজোগুণ-প্রধান সমাস-বহুল রচনারীতি কোন কোন সমালোচকের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। যেমন পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিত Weber বলেছেন— ‘Bana’s prose is an Indian wood where progress is rendered impossible--'. Dr. S. N. Dasgupta বলেছেন—His choice of subject may be good, but his choice of scale is fatal.’ এইরকম বিরুদ্ধ সমালোচনা থাকলেও বাণের কাব্যের উপাদেয়তা অস্বীকার করা যায় না। রঙের সূক্ষ্ম ব্যবহারে চিত্রনির্মাণে, প্রথাভির্ভূত উপমা-প্রয়োগে, বিশেষণের অতিরিক্ত ব্যঞ্জনাসৃষ্টিতে, সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি ও গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তিতে বাণ যা সৃষ্টি করেছেন তা এককথায় অতুলনীয়। সাহিত্যে এমন কোন ভাব নেই যা বাণভট্ট পরিস্ফুট করেন নি । সেইজন্যই বলা হয়— ‘বাণোচ্ছ্বিষ্টং জগত্সর্বম্ ।‘ বাণের লেখনীর অনায়াস চলনকে লক্ষ্য করে রাজশেখর বলেছেন— ‘বাণস্য বাণ্যনার্যেব স্বচ্ছন্দা ভ্রমটি ক্ষিতৌ’ ।‘ জনৈক সমালোচক যে বলেছিলেন ‘কাদম্বরী রসজ্ঞানামাহারোঽপি ন রোচতে’ তা অত্যুক্তি নয়, রসজ্ঞের বিচার ।
-----------
No comments:
Post a Comment