SANS-H-CC-T-03
राजधर्मपालन-प्रसङ्गेन राज्ञा कथमाचरितव्यम् इत्यस्मिन् विषये शुकनासेन यदुपदिष्टं तत्सर्वं सविमर्शमालोच्यताम्।
अथवा,
व्यसनासक्तस्य राज्ञः दुष्परिणामः, तथा चन्द्रापीडेन किं करणीयम् इत्यस्मिन् विषये शुकनासेन यदुपदिष्टं तत्सर्वं सविमर्शमालोच्यताम्।
अथवा,
चन्द्रापीडं प्रति शुकनासस्य राजनीतिविषयकमुपदेशं सम्यक् आलोचयत।
अथवा, राज्ञः आचरणविधिविषये शुकनासेन यदुपदिष्टं तत् सविमर्शमालोच्यताम्।
উত্তরম্—
সংস্কৃত গদ্যসাহিত্যে বাণভট্ট শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধর কবি। তাঁর অবদান দুটি—কাদম্বরী ও হর্ষচরিত । শুকনাসোপদেশ কাদম্বরী কাব্যেরই অংশবিশেষ। উজ্জ্বয়িনীরাজ তারাপীড়ের পরম জ্ঞানী মন্ত্রী শুকনাস। তারাপীড়ের পুত্র চন্দ্রাপীড় যৌবরাজ্যে অভিষেকের প্রাক্কালে রাজধর্ম বিষয়ে উপদেশ লাভের জন্য শুকনাসের কাছে যান। শুকনাস পরম স্নেহে চন্দ্রাপীড়কে যৌবনের কুপ্রভাব, রাজলক্ষ্মীর অনিষ্ট উৎপাদনের ক্ষমতা, ব্যসনাসক্ত রাজার দুষ্পরিণাম এবং কীভাবে তা থেকে মুক্ত হয়ে যথাযথভাবে রাজধর্ম পালন করতে হবে সে সম্বন্ধে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় উপদেশ দান করেন।
চন্দ্রাপীড়ের প্রতি শুকনাসের রাজনীতি বিষয়ে উপদেশঃ-
শুকনাস চন্দ্রাপীড়কে বলেন—‘বৎস চন্দ্রাপীড়! রাজধর্ম পালনের জন্য যা যা জানা প্রয়োজন সবই তুমি জান। তাই তোমাকে উপদেশ দেওয়ার মতো সামান্য বিষয়ও অবশিষ্ট নেই। তবুও তুমি এখন যৌবনকালে উপনীত, এই সময়ে বুদ্ধি শাস্ত্রজলে নির্মল হলেও প্রায়ই কলুষিত হয়। গুরুর উপদেশ বুদ্ধিকে কলুষমুক্ত করে।
দুর্জ্ঞেয়-স্বভাব রাজলক্ষ্মী রাজাকে সর্বদা কুপথে পরিচালিত করে। দুরাচারিণী লক্ষ্মী কোনভাবে আশ্রয় করলেই রাজারা দুর্বিনীত হয়ে ওঠেন। ক্ষণিক মনোহর সম্পদের দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে কোন কোন রাজা জ্ঞানীদের নিন্দাভাজন হয়ে পড়েন। বিষয়াসক্ত হয়ে তাঁরা নানাবিধ যন্ত্রণা ভোগ করেন। এতে মনের চঞ্চলতা বাড়ে। তাঁরা তখন কাঁকড়ার মতো তির্যকভাবে চলেন—‘কুলীরা ইব তির্যক্ পরিভ্রমন্তি।‘ তাঁদের স্বকীয় বিচারশক্তি লোপ পায়। তাঁরা পঙ্গুর মতো অন্যের দ্বারা পরিচালিত হন। তাঁরা নিকটবর্তী শুভাকাঙ্ক্ষীদের দুঃখ দেন। ধীরে ধীরে নানা ধরণের ব্যসনে আসক্ত হয়ে কর্তব্যভ্রষ্ট হয়ে বিপরীত আচরণ করেন। এই অবস্থায় তাঁরা বন্ধুজনকে চিনতে পারেন না।
রাজকার্য মন্ত্রসাধ্য। কিন্তু বিপথগামী রাজারা মন্ত্রিদের উৎকৃষ্ট মন্ত্রণা দ্বারাও নিজেদের কর্তব্য বুঝতে পারেন না। ধনলালসায় বিভ্রান্ত হয়ে জগতের সকল বস্তুকেই ধনময় দেখেন। মদ্যাসক্তিতে উগ্র স্বভাব বর্ধিত হওয়ায় তাঁরা অন্যের প্ররোচনায় প্রজাদের বিনাশ সাধন করেন। তাঁরা অদণ্ড্যকে দণ্ড দান করে লোকবিনাশ করেন। নেত্ররোগাক্রান্ত ব্যক্তি যেমন দূরের বস্তু দেখতে পান না, তেমনি রাজারাও নিজেদের পরিণাম দেখতে পান না। এক সময় রাজগৃহ নীচাশয় লোকের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। রাজারা কামজ ব্যসন ও ক্রোধজ ব্যসনে লিপ্ত হয়ে নিজেদের দুরবস্থা বুঝতে পারেন না।
কিছু রাজা আছেন যাঁদের সভায় স্বার্থপরায়ণ ধনলুব্ধ কিছু ধূর্তলোক থাকে। তারা রাজাদের বিনাশকারক কুপরামর্শ দিয়ে বলে-- পাশাখেলা হল বিনোদন—‘দ্যূতং বিনোদঃ।‘ পরদারগমন হল বিদগ্ধতা—‘পরদারাভিগমনং বৈদগ্ধ্যম্।‘ মৃগয়া হল ব্যায়াম-স্বরূপ। মদ্যপান বিলাসিতা—‘পানং বিলাসঃ।‘ প্রমত্ততা হল শৌর্য। নিজপত্নীকে পরিত্যাগ করা হল অনাসক্তি। গুরুর উপদেশ অবজ্ঞা করা হল পরের অধীন না হওয়া। নৃত্যগীতাদিতে আসক্তি হল রসিকতা। অন্যের তিরস্কার সহ্য করা হল ক্ষমা। স্বেচ্ছাচারিতা হল প্রভুত্ব। স্তুতিপাঠকের প্রশংসাই যশ। সূক্ষ্মরূপে পর্যালোচনা না করাই হল অপক্ষপাতিত্ব।
এইভাবে প্রতারণা-কুশল ধূর্তরা রাজার কাছে দোষকে গুণরূপে প্রশংসা করে নিজেরাই আবার মনে মনে উপহাস করে মিথ্যা স্তুতি দ্বারা রাজাকে প্রতারণা করতে থাকে। রাজারা ধনের অহংকারে উন্মত্ত হয়ে মিথ্যা স্তুতিকে সত্য মনে করেন। মিথ্যাগর্বে তাঁরা নিজেদের উপর দেবত্ব আরোপ করেন। এই সময়ে তাঁরা মাননীয়দের সম্মান করেন না, পণ্ডিতদের উপহাস করেন, বৃদ্ধোপদেশকে তিরস্কার ভাবেন, সহৃদয়চিত্ত ও অনুরক্ত ভৃত্যদের উচ্ছেদ করেন। এইভাবে তাঁরা নিজেদের বিনাশ সাধনে উদ্যত হন।
এরপর শুকনাস বলেন—হে কুমার! রাজকার্য অত্যন্ত জটিল, দুঃখজনক, ভয়ঙ্কর ও বিঘ্নবহুল। তুমি এমন আচরণে যত্নবান্ হবে যাতে-- ‘নোপহস্যসে জনৈঃ, ন নিন্দ্যসে সাধুভিঃ, ন ধিক্ ক্রিয়সে গুরুভিঃ, নোপ্লভ্যসে সুহৃদ্ভিঃ, ন শোচ্যসে বিদ্বদ্ভিঃ।‘
তুমি এমনভাবে চলবে যাতে ধূর্ত বিটগণ তোমাকে প্রতারিত করতে না পারে, সেবকরূপ নেকড়েরা তোমার সম্পত্তি লুটে না নেয়, ধূর্তরা বঞ্চিত না করে, স্ত্রীলোকের দ্বারা প্রলোভিত না হও, লক্ষ্মী তোমাকে বিড়ম্বিত না করে। মদে মত্ত হবে না। বিষয়ভোগ তোমাকে যেন আসক্ত না করে, সুখ তোমাকে অপহরণ না করে।
শেষে শুকনাস বলেন—তুমি স্বভাবতঃ ধীর, পিতার দেওয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। তোমাকে আবার বলি—‘বিদ্বাংসমপি সচেতনমপি মহাসত্ত্বমপি অভিজাতমপি ধীরমপি প্রযত্নবন্তমপি পুরুষমিয়ং দুর্বিনীতা খলীকরোতি লক্ষ্মীরিতি।‘ কাজেই এই রাজলক্ষ্মী থেকে সতর্ক থাকবে।
উপসংহার—ধর্মশাস্ত্রে ও নীতিশাস্ত্রে উল্লিখিত রাজধর্ম পালন প্রসঙ্গে রাজার কর্তব্য, অকর্তব্য, ব্যসন-বিষয়ে সতর্কতা, চাটুকার-ধূর্ত-মদ্যাশক্তি থেকে দূরে থাকা, জ্ঞানবৃদ্ধদের উপদেশ শোনা, সুষ্ঠুভাবে মন্ত্রণা করা এবং তার রূপায়ণে যত্নবান্ হওয়া, সংযত জীবন যাপন করা এবং সর্বোপরি প্রজাদের সার্বিক কল্যাণসাধন করা ইত্যাদি বিষয়গুলিই শুকনাসের উপদেশের মাধ্যমে কবি প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন। ভাব ও ভাষার অপূর্ব মেলবন্ধনে এই অংশটির চমৎকারিত্ব অনস্বীকার্য।
------
No comments:
Post a Comment