🔻সংস্কৃত সাহিত্যের একপরম সম্পদ কবি ভর্তৃহরি ।কবির জীবনের রসায়ন বরই অদ্ভুত। ভর্তৃহরি কে — এনিয়ে সংস্কৃতসাহিত্যে বিভিন্ন জনপ্রিয় কিংবদন্তীর অবতারণা করা হয়েছে । সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যান্য কবিদের ব্যক্তি জীবন ও সময়কাল নিয়ে যে সমস্যা দেখা দেয় , ভর্তৃহরির ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনুরূপ ।
কিংবদন্তী
🔻 কিংবদন্তী অনুসারে ভর্তৃহরি উজ্জয়িনীরাজ গন্ধর্বসেনের পুত্র । তথ্য অনুসারেগন্ধর্বসেন খ্রীষ্টীয় প্রথম বা দ্বিতীয় শতকে উজ্জয়িনী শাসন করেন । গন্ধর্বসেনের দুই পত্নী ছিল । প্রথমা পত্নীর গর্ভজাত পুত্র ভর্তৃহরি এবং দ্বিতীয়া পত্নীর পুত্র হলেন বিক্রমাদিত্য ।
🔻ধারানৃপতি ছিলেন বিক্রমাদিত্যের মাতামহ । গন্ধর্বসেনের মৃত্যুর পর অপুত্রক ধারানৃপতি গন্ধর্বসেনের দুই পুত্রকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন এবং লালনপালন করেন । গন্ধর্বসেনের তত্ত্বাবধানে রাজকুমারদ্বয়ের বিদ্যাশিক্ষার সাথে সাথে সমরশিক্ষা , রাজনীতি , ধর্মনীতিপ্রভৃতিরও পাঠ চলতে থাকে । রাজকুমারদ্বয়ের অভিষেককাল সমাগত হলে ধারানৃপতি পক্ষপাত দেখিয়ে দৌহিত্র বিক্রমাদিত্যকে সিংহাসনে বসাতে চাইলেন । জ্যেষ্ঠভ্রাতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিক্রমাদিত্য উজ্জয়িনীর সিংহাসন প্রত্যাখ্যান করেন ।
🔻অগত্যা ভর্তৃহরিই রাজা হন এবং বিক্রমাদিত্য তার প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন । এই সময় উজ্জয়িনী ও ধারানগরী একই শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় । বিক্রমাদিত্য নিষ্ঠার সাথে প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্বভার পালন করতে থাকলে ভর্তৃহরিক্রমশঃ রাজকার্যের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন এবং রূপবতী পত্নী অনঙ্গসেনার প্রতি অত্যধিক আসক্তির কারণে রাজ্যশাসনে অবহেলাও দেখাতে থাকেন । শুধু তাই নয় , তিনি নানাবিধ ব্যসনেও আসক্ত হতে থাকেন । বিক্রম জ্যেষ্ঠ্যভ্রাতার পরিণতি সম্পর্কে তাকে সতর্ক করলে ক্রুদ্ধ ভর্তৃহরি বিক্রমকে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে অপসারিত করে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেন ।
🔻 বিক্রমাদিত্য এই সময় বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে এক গ্রামে এসে থাকেন । তার নামানুসারে , পরে গ্রামটি ‘ বিক্রমপুর ’ নামে অভিহিত হয় । | উজ্জয়িনী রাজ্যে তখন ঘোরতর অব্যবস্থা ও অশান্তি চলতে থাকে । এমন সময় এক ব্রাহ্মণ রাজাকে একটি ‘ ফল ’ উপহার দিয়ে বলেন যে , ফলটি বহু উদ্দেশ্যসাধক । এর দ্বারা তার অশান্তি দূর হবে এবং রাজ্যের সমৃদ্ধিও বৃদ্ধি পাবে ।
🔻রাজা এই আশ্চর্যফলটি তার প্রিয়তমা রাজমহিষীকে উপহার দেন । রাজমহিষী অনঙ্গসেনার এক গুপ্ত প্রেমিক ছিলেন । রাজমহিষী ফলটি তার প্রেমিককে উপহার দেন । প্রেমিক পুরুষ আবার ফলটি তার অন্য প্রেমিকাকে দান করেন । সেই প্রেমিকা আবার মনে মনে ভর্তৃহরিকে কামনা করতেন । মহামূল্য ফলটি তিনি আবার রাজার মঙ্গল কামনায় তাকে উপহার দেন । রাজা ভর্তৃহরি ফলটি পুনরায় তার কাছে ফেরৎ আসার কারণ অনুসন্ধান করে সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হলেন এবং রাজমহিষীর বিশ্বাসঘাতকতায় অত্যন্ত মর্মাহত হলেন । জীবনের প্রতি রাজার মোহ ধীরে ধীরে কাটতে থাকে । ভর্তৃহরি তার নীতিশতকের দ্বিতীয় শ্লোকে এই ঘটনারই বর্ণনা করেছেন ।
যাং চিন্তায়ামি সততং ময়ি সা বিরক্তা ।
সাপ্যন্যমিচ্ছতি জনং স জনোহন্যসক্তঃ
অস্মৎকৃতে চ পরিতুষ্যতি কাচিদন্যা
ধিক্ তাং চ তং চ মদনং চ ইমাং চ মাং চ । ।
(নীতিশতক ২ নং শ্লোক)
শ্লোকের অর্থঃ-
আমি আমার যে প্রেমাস্পদাকে সর্বদা চিন্তা করি , আমার সেই প্রেমাস্পদা আমার প্রতি অনুরাগ পাোষণ করেন না , তিনি আবার অন্য পুরুষকে কামনা করেন । আমার প্রেমাস্পদার প্রার্থিত পুরুষ অন্য এক রমণীতে আসক্ত , আমার চিন্তায় আবার অন্য এক রমণী পরিতৃপ্তি লাভ করেন । এরকম অবস্থায় আমার প্রেমাস্পদাকে , প্রেমাস্পদার প্রার্থিত পুরুষকে , কামদেবকে , আমার প্রতি অনুরক্তা সেই নারীকে এবং আমার নিজেকে ধিক্কার জানাই ।
🔻 রাজার কাছে নিজের গোপন প্রেম ধরা পড়ে যাওয়ায় মহিষী অনঙ্গসেনা লজ্জায় আত্মহত্যা করেন । এরপর ভর্তৃহরি পিঙ্গলা নামক এক রাজকন্যার পাণিগ্রহণ করেন । রাজা ভর্তৃহরি একবার শিকারে গিয়ে এক দৃশ্য দেখেন । এক শিকারী একটি হরিণকে হত্যা করে । হরিণের শোকে সঙ্গিনী হরিণীটি সেখানেই প্রাণত্যাগ করে । এদিকে শিকারী নিজেও সর্পাঘাতে নিহত হয় । আশ্চর্যজনকভাবে শিকারীর পত্নীও সেখানে প্রাণত্যাগ করেন । ভর্তৃহরি অদ্ভুত এই দৃশ্য পিঙ্গলাকে বর্ণনা করেন । পিঙ্গলা সব শুনে রাজাকে জানালেন যে , সতী স্ত্রী এভাবেই পতির শাোকে প্রাণ ত্যাগ করেন ।
🔻 রাজা ভর্তৃহরি পিঙ্গলার কথা শুনে একদিন শিকারে গিয়ে তার সমস্ত বসন পশুর রক্তে রঞ্জিত করে অনুচরদের হাতে পিঙ্গলার নিকট পাঠিয়ে দিলেন এবং জানালেন যে বাঘের হাতে রাজার মৃত্যু হয়েছে । অনুচরের মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে পিঙ্গলা সেই মুহূর্তেই মৃত্যু বরণ করেন । রাজপ্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করে রাজা সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হয়ে নিজের কপটতার গ্লানিতে দগ্ধ হতে থাকেন । সংসার জীবনের অসারতা উপলদ্ধি করে গোরক্ষনাথ নামক এক মহাযোগীর নিকট তিনি সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন ।
------------
No comments:
Post a Comment