মহাকবি ভারবি ও কিংবদন্তী
“ অবন্তি সুন্দরী কথা ' গ্রন্থানুসারে , উত্তর - পশ্চিম ভারতের অধুনা গুজরাটের অন্তর্গত আনন্দপুর নামক স্থানে কৌশিক গোত্রীয় এক গ্রাহ্মণ পরিবার বাস করতেন । পরে তাঁরা দাক্ষিণাত্যে নাসিকের অন্তর্গত অচলপুরে বসবাস করতেন । সে বংশের নারায়ণস্বামীর এক পুত্রের নাম ছিল দামোদর । এ দামোদর মহাকবি ভারবি ।
স্থানীয় রাজকুমার বিষ্ণুবর্ধনের সঙ্গে ভারবির বন্ধুত্ব হয় এবং রাজকুমার বিষ্ণুবর্ধনের সঙ্গে ভারবি একবার মৃগয়ায় গিয়ে ক্ষুধার তাড়নায় মাংস ভক্ষণ করে জীবন রক্ষা করতে বাধ্য হন । এ কারণে ভারবি মাতাপিতার কাছে ফিরে যেতে অত্যন্ত লজ্জা বোধ করেন , এবং পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য স্বেচ্ছায় বনবাস জীবন বেছে নেন ।
বনবাসকালে দুর্বিনীত নামে এক রাজকুমারের সঙ্গে ভারবির সাক্ষাৎকার ঘটে । রাজকুমার দুর্বিনীতও পিতার অসন্তোষের কারণে বনবাসে এসেছিলেন । রাজপুত্র দুর্বিনীত ভারবির কবিত্বের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হন এবং কবিকে নিজ শিবিরে নিয়ে আসেন । রাজকুমার দুর্বিনীতের শিবিরে বাস কালে কবি কাঞ্চীর পল্লবরাজ সিংহবিষ্ণুর স্তুতি করে একটি শ্লোক রচনা করে পল্লবরাজের কাছে প্রেরণ করলে , পল্লবরাজ সিংহবিষ্ণু ভারবির কবিত্বে প্রীত হয়ে কবিকে তাঁর রাজসভায় সাদর আমন্ত্রণ জানান এবং স্বীয় পুত্র মহেন্দ্র বিক্রমের সঙ্গে তিনি কবিকে অভিন্ন করে দেখেন । এ উৎস থেকে তা জানা যায় যে , কবি ভারবির মনোরথ নামে এক পুত্র ছিল , মনোরর চতুর্থ পুত্রের নাম ছিল বীরদত্ত । বীরদত্তের সঙ্গে গৌরীর বিবাহ হয় , এবং যথাকালে তাদের পুত্র দণ্ডী জন্মগ্রহণ করে ।
মহাকবি ভারবির কিরাতার্জুনীয়ম্ রচনার প্রেক্ষাপট বিষয়ে কিংবদন্তী
মহাকবি ভারবি কর্তৃক রচিত কিরাতার্জুনীয়ম্ রচনার আড়ালে একাধিক গল্পের প্রচলন থাকলেও আমরা জনপ্রিয় একটি গল্প তুলে ধরছি-
ভারবির পিতা ছিলেন শ্রীধর এবং সুশীলা তার মাতা । ভারবি ভৃগুকচ্ছের কোন এক চন্দ্রকীর্তির কন্যা রসিকার পাণিগ্রহণ করেন এবং অভিনব যৌবনেই ভারবি খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করেন। কিন্তু তার পিতা প্রকাশ্যেই ভারবির খ্যাতির নিন্দাবাদ করতে থাকেন । পিতার বিরূপ আচরণে ক্ষুব্ধ ও অসহিষ্ণু হয়ে পিতাকে হত্যা করবার উদ্দেশ্য একদিন রাতে পিতার শয়নকক্ষে প্রবেশ করে পিতা - মাতার কথাবার্তা থেকে যখন ভারবি জানতে পারলেন যে , অপ্রত্যাশিত যশের আতিশয্য পুত্রের মনে অহংকারের জন্ম দিতে পারে , সে আশঙ্কা থেকেই পিতা পুত্রের নিন্দা করেন , তখন পিতৃহত্যার পাপ চিন্তায় অত্যন্ত অনুতপ্ত ও অনুশোচনাগ্রস্ত হয়ে , পিতারই পরামর্শে সে পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য ছ ' মাস সস্ত্রীক শ্বশুরালয়ে স্বেচ্ছাবাস স্বীকার করেন । ভারবির মুখে এ বৃত্তান্ত শুনে শ্বশুরালয়ের লোকেরাও তাদের দু'জনকে গৃহে রেখে অন্যত্র বাসের জন্য চলে গেলেন ।
দারিদ্র্যের তাড়নায় নিতান্ত অসহায় হয়ে একদা ভারবি একটি বৃক্ষপত্রে , শ্লোকার্ধ রচনা করে স্ত্রীর হাতে দিয়ে তা বিক্রী করতে পাঠিয়ে দিলে , বর্ধমান নামে কোন এক বণিকের পত্নী তা ' কিনে নিয়ে শয়নকক্ষের পালঙ্কে স্বর্ণাক্ষরে তা খোদাই করে রাখলেন । শ্লোকার্ধে লেখা ছিল — “ সহসা বিদধীত ন ক্রিয়ামাবিবেক পরমাপদাং পদম্ " ( ২ / ৩০ ) । অর্থাৎ সহসা কোন কাজ করা উচিত নয় , কেননা অবিমৃশ্যকারী প্রবল বিপদগ্রস্ত হয় ।
দীর্ঘ পঞ্চদশ বর্ষ পরে একদিন বণিক বর্ধমান ফিরে এলেন স্বগৃহে , এবং হঠাৎ দেখতে পেলেন তাঁর স্ত্রী সুদর্শন এক তরুণের সঙ্গে একই শয্যায় শায়িত রয়েছেন । এ দৃশ্য দেখে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে নিজের অবিশ্বস্ত পত্নী এবং তরুণ উভয়কে হত্যা করবার উদ্দেশ্যে তরবারি উত্তোলন করলে , আকস্মিকভাবে তার দৃষ্টি পড়ল পালঙ্কে খোদিত সেই শ্লোকার্ধের উপর । তৎক্ষণাৎ বণিক সংযত হয়ে সে পাপকর্ম থেকে নিবৃত্ত হলেন । অন্তঃপর বণিক বর্ধমান স্ত্রীর মুখে জানতে পারলেন যে তার স্ত্রীর সঙ্গে শায়িত তরুণটি তাঁরই পুত্র যার জন্ম হয়েছিল বণিক বাণিজ্যের জন্য দূর দেশে গমন করার কয়েকদিন পরে । বণিক অত্যন্ত প্রীত হয়ে ভারবিকে প্রভূত অর্থ দান করেন অত্যধিক কৃতজ্ঞতাবশত । উল্লেখ করা যেতে পারে , ভারবি শ্বশুরালয়ে থাকাকালীন প্রত্যহ গাোচারণের কর্মে যখন নিযুক্ত থাকতেন , তখনই কাজের ফাকে অবসর সময়ে বৃক্ষপত্রে এক একটি করে শ্লোক লিপিবদ্ধ করে সমগ্র “কিরাতার্জুনীয়ম্ ” মহাকাব্যটি রচনা করেছিলেন ।
---------
গল্পটির উৎসঃ- পণ্ডিত গৌরীনাথ পাঠক কর্তৃক সম্পাদিত ''কিরাতার্জুনীয়ম্ ”
মহাকাব্যের সংস্কৃতে রচিত ভূমিকা।
No comments:
Post a Comment