কবিকুল চূড়ামণি কালিদাস সমন্ধে প্রচলিত কিছু জনপ্রিয় কিংবদন্তী
মহাকবি কালিদাস আপামোর ভারতবাসীর হৃদাসনে সদা বিরাজিত । কিংবদন্তী মহাকবি কলিদাস তাঁর অমর সৃষ্টির দ্বারা সংস্কৃত সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে একাসনে বসার এক সম্মানজনক পদ দিয়ে গেছেন । কিন্তু এহেন মহাকবি নিজের জন্মস্থান , আবির্ভাবকাল পারিবারিক জীবন প্রভৃতি সম্বন্ধে একটি বাক্যও ব্যয় করেননি । কবির এই নীরবতা থেকে জন্ম একাধিক কিংবদন্তীর ।আজ আমরা অত্যন্ত জনপ্রিয় কিছু কিংবদন্তী নিয়ে উপস্থিত হয়েছি আমাদের এই আসরে।
কিংবদন্তী ১
কর্ণাট রাজ্যের রাজমহিষী ছিলেন বিদুষী এবং সেই সঙ্গে পাণ্ডিত্যাভিমানিনীও । সমকালীন কবিগণ তার প্রশংসাবাণীকে কবিত্বের মাপদণ্ড হিসেবে বিচার করতেন । একদা কালিদাস তার লেখা কাব্যগুলিকে মহিষীর কাছে পাঠালেন প্রশংসাসূচক অভিমত পাওয়ার আশায় । কিন্তু হায় পাণ্ডিত - গর্বিত সেই মহিষী কালিদাসের কাব্যগুলি না পড়েই অত্যন্ত অবমাননাকর এক মন্তব্য লিখে পাঠালেন ।মন্তব্যটি এই –
“একো২ভূন্নলিনাৎ ততশ্চ পুলিনাৎ বল্মীকতশ্চাপর-
স্তে সর্বে কবয়স্ত্রিজগতগুরবস্তেভ্যো নমস্কুর্মহে । ।
অর্বাঞ্চো যদি গদ্যপদ্যরচনৈশ্চেতশ্চমৎকুৰ্বতে ।
তেষাং মূর্ধ্নি দধামি বামাচরণং কর্ণাটরাজপ্রিয়া ॥ ”
অর্থ হল ' বেদকর্তা ব্রহ্মা , মহাভারতকার ব্যাসদেব এবং রামায়ণকার বাল্মীকি - এই তিনজনকেই আমি কবি বলে মনে করি এবং প্রণাম জানাই । এ ছাড়া আর যাৱা গদ্যপদ্য রচনা করে কবিত্ব প্রকাশ করতে চায় , তাদের মাথায় আমি বাম পা স্থাপন করি ' [ তেষাং মূর্ধ্নি ( মম ) বামচরণং দধামি ] । শোনা যায় পরবর্তীকালে কণাটরাজমহিষী কালিদাসের কাব্যগুলি পড়ে অনুপ্রাণিত ও প্রীত হন এবং কালিদাসকে মহাসমাদরে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসেন । কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করলেন কালিদাসের পদধুলি নিয়ে এবং সেই মন্তব্যটি পুনরায় আবৃত্তি করে । তবে এবারে অর্থ করলেন চতুর্থ চরণের অন্বয় পরিবর্তন করে এবং তখন বোঝানো হল – ঐ তিন কবি ছাড়াও যারা আজকাল কাব্যাদি রচনা দ্বারা মানুষকে চমৎকৃত করেন তাদের বাম পা আমি মাথায় তুলে নিই । ' [ তেষাং বামচরণং ( মম )মূর্ধ্নি দধামি ] ।
কিংবদন্তী ২
অন্য এক কিংবদন্তীতে বলা হয়েছে যে, দণ্ডী এবং কালিদাস – এই দুজনের মধ্যে কবি হিসাবে কে বড় এই নিয়ে বিবাদ শুরু হলে স্বয়ং সরস্বতী সেখানে আবির্ভূত হন এবং সিদ্ধান্ত জানান – ‘কবির্দণ্ডী কবির্দণ্ডী কবির্দণ্ডী ন সংশয়ঃ ' । একথা শুনে কালিদাস নিজেকে খুব অপমানিত বোধ করেন এবং জানতে চান কবি হিসাবে তার মূল্য কত । সরস্বতী তখন ' “ত্বমেবাহং ন সংশয়ঃ ” অর্থাৎ “ তুমি স্বয়ং সরস্বতী ' - এই বলে তাকে সান্ত্বনা দেন ।
কিংবদন্তী ৩
কিংবদন্তী অনুসারে রাজা কুমারদাস একদিন তাঁর রক্ষিতার গৃহের দেওয়ালে ‘কমলে কমলোৎপত্তি শ্রুয়তে ন তু দৃশ্যতে ' – এই পংক্তিটি লিখে আসেন এবং তাকে বলে আসেন যে ব্যক্তি এ পংক্তির অসমাপ্ত পরবর্তী অংশ পূরণ করতে পারবেন তাকে তিনি পুরস্কার প্রদান করবেন । ঘটনাচক্রে পংক্তিটি কালিদাসের নজরে আসে এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গেই ‘বালে তব মুখাম্ভোজে দৃষ্টমিন্দীবরদ্বয়ম্’ - এই পংক্তি দিয়ে শ্লোকটির সম্পূর্ণতা আনেন । নিজের রচনা বলে রাজার কাছে পুরস্কার দাবী করবেন স্থির করে সেই গণিকা কালিদাসকে হত্যা করে । রাজা কিন্তু তাঁর গণিকার অপকীর্তি ধরে ফেলেন এবং নিদারুণ দুঃখে তাঁর প্রিয় বন্ধু কালিদাসের চিতায় আত্মবিসর্জন দেন ।
কিংবদন্তী ৪
কোন এক বিদুষী রাজকন্যা একবার এক ধনুক - ভাঙ্গা পণ করলেন - যে পণ্ডিত তার তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন তাকেই তিনি পতিত্বে বরণ করবেন ।বহু পণ্ডিত এলেন , কিন্তু কেউই পারলেন না প্রশ্নের সমাধান করতে । বিফল মনোরথ হয়ে তারা পরামর্শ করলেন - এই অভিমানিনীর উচিত শিক্ষা দেবেন তারা এক নিরেট মূর্খের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে । খোঁজে বেরোলেন তারা । একদিন দেখলেন , এক মহামূর্খ কোন এক গাছের ডালে বসে আছেন এবং যেই ডালে বসে আছেন তারই গোড়ার দিক অম্লান বদনে কেটে চলেছেন । স্থির করলেন - এর চাইতে মূর্খ আর হয় না । নিয়ে এলেন ওঁকে সেই বিদুষীর রাজকন্যার কাছে।
রাজকন্যা মুখে কোন প্রশ্ন করলেন না । সংকেতে একটি আঙ্গুল দেখালেন । মূর্খ কিছু না বুঝেই দুটি আঙ্গুল দেখালেন । অতঃপর রাজকন্যা তিনটি এবং উত্তরে সেই মুখ চারটি আঙ্গুল প্রদর্শন করলেন । অবশেষে রাজকন্যা পাঁচটি আঙ্গুল দেখালেন । মূর্খ ভাবলেন – চড় দেখাচ্ছেন রাজকন্যা । সঙ্গে সঙ্গে তিনিও ঘুষি পাকিয়ে দেখালেন । প্রশ্নের তাৎপর্য বা উত্তরের সারমর্ম যাই হোক না কেন , রাজকন্যা স্বীকার করলেন যে তিনি পরাজিত হয়েছেন । মহাসমারোহে রাজকন্যার বিয়ে হল সেই মূর্খের সঙ্গে । পণ্ডিতদের ইচ্ছা পূর্ণ হ ' ল । |
বাসরগৃহে স্বামী - স্ত্রী আলাপ করছেন - এমন সময় বাইরে উটের ডাক শোনা গেল ।স্ত্রী প্রশ্ন করলেন – “ কিসে ডাকছে ' ? স্বামী উত্তর করলেন - “ উষ্ট’’ । পরে সংশোধন করে বললেন ‘ উট্র । স্ত্রীর বুঝতে বাকী রইল না যে নববিবাহিত লোকটি নিতান্তই গ্রাম্য এবং মূর্খজন । ক্ষোভে , দুঃখে , সেই মুহুর্তেই বের করে দিলেন তাকে । প্রাণ ত্যাগের ইচ্ছায় মূর্খ জলে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হলেন । এমন সময় দেবী সরস্বতী আবির্ভূতা হয়ে তাঁকে বর দিলেন যে তিনি জগতে অদ্বিতীয় কবি হবেন । অতঃপর তিনি রাজবাড়ীতে আবার প্রবেশ করলেন এবং স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন । বললেন - “ অস্তি কশ্চিদ্ বাগবিশেষঃ । " স্ত্রী অবাক হলেন স্বামীর মুখে এই বিশুদ্ধ সংস্কৃত শুনে । পরবর্তীকালে এই তিনটি শব্দ দিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন তিন অমর সংস্কৃত কাব্য । ‘অস্তি ’ দিয়ে শুরু করলেন কুমারসম্ভব ' , ' কশ্চিৎ ’ দিয়ে ' মেঘদূত ' এবং বাক্ , দিয়ে রঘুবংশ । এই মূর্খই , যিনি সরস্বতীর বরে পরে হয়েছিলেন মহাকবি , আমাদের সবার প্রিয় কবি বাণীর বরপুত্র কালিদাস ।
ঋণ স্বীকারঃ- সত্যনারায়ণ চক্রবর্তী কৃত অভিজ্ঞানশকুন্তলম্- এর ভূমিকা পৃঃ-৩৮.
কমলে কমলোৎপত্তি
ReplyDeleteশ্রুয়তে ন তু দৃশ্যতে
বালে তব মুখাম্ভোজে দৃষ্টমিন্দীবরদ্বয়ম্’
বাংলা অর্থটা কেউ বললে খুবই উপকার হতো।
কমলেই কমলের উৎপত্তি বলে শোনা যায়, কিন্তু দেখা যায় না l হে নারী, তোমার মুখরূপ কমলে আঁখিরূপ নীলপদ্মদ্বয় দৃষ্ট হচ্ছে ।
Delete