মহাভারতের কচ ও দেবযানী বৃত্তান্ত
পুরাকালে দেবতা এবং অসুরগণ ত্রিলোকের অধিকার পাবার জন্য নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করছিলেন । বিজয়লাভের জন্য দেবতারা আঙ্গিরস বৃহস্পতিকে এবং অসুরেরা ভার্গব শুক্রকে নিজ নিজ গুরুরূপে বরণ করেন । এই দুই ব্রাহ্মণও নিজেদের মধ্যে একে অপরকে অতিক্রম করার চেষ্টা করতেন।
যুদ্ধে যখন দেবতারা অসুরদের বধ করেছিলেন , তখন শুক্রাচার্য তাঁর বিদ্যার সাহায্যে তাঁদের জীবিত করেছিলেন । কিন্তু অসুরেরা যে দেবতাদের মেরে ফেলেছিলেন , তাদের বৃহস্পতি জীবিত করতে পারেননি । কেননা শুক্রাচার্য সঞ্জীবনী মন্ত্র জানতেন ,কিন্তু বৃহস্পতি জানতেন না । এতে দেবতাগণ খুব দুঃখিত হয়েছিলেন ।
তাঁরা ভয় পেয়ে বৃহস্পতির জ্যেষ্ঠ পুত্র কচের কাছে গিয়ে তাঁকে অনুরোধ করেন , “ ভগবান্ ! আমরা আপনার শরণাগত । আপনি আমাদের সাহায্য করুন । অমিত তেজস্বী বিপ্রবর শুক্রাচার্য যে সঞ্জীবনী বিদ্যা জানেন , আপনি সেই বিদ্যা শীঘ্রই আয়ত্ত করুন ; আমরা আপনাকে যজ্ঞের ভাগীদার করে নেব ।
সেই সময় শুক্রাচার্য বৃষপর্বার নিকটে ছিলেন । দেবতাদের অনুরোধে কচ শুক্রাচার্যের কাছে গিয়ে আবেদন করলেন-“ আমি মহর্ষি অঙ্গিরার পৌত্র এবং দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ , আপনি আমাকে আপনার শিষ্য করুন , আমি সহস্র বৎসর আপনার কাছে থেকে ব্রহ্মচর্য পালন পূর্বক সেবা করব । শুক্রাচার্য বললেন - ‘ স্বাগত পুত্র ! আমি তোমার আবেদন স্বীকার করছি । আমি তোমার সৎকার করব , কেন - না তোমাকে সৎকার করলে দেবগুরু বৃহস্পতিকেই সৎকার করা হবে বলে আমি মনে করি । কচ শুক্রাচার্যের নির্দেশানুসারে ব্রহ্মচর্যব্রত গ্রহণ করলেন ।
তিনি গুরুকে প্রসন্ন রাখার পাশাপাশি গুরুকন্যা দেবযানীকেও খুশি রাখতেন । পাঁচশত বৎসর অতিক্রান্ত হবার পর দানবেরা কচের অভিপ্রায় জানতে পারল । তারা ক্রুদ্ধ হয়ে গোচারণের সময় বৃহস্পতির ওপর দ্বেষবশত এবং সঞ্জীবনী বিদ্যা রক্ষার অভিপ্রায়ে কচকে মেরে টুকরো টুকরো করে নেকড়ে বাঘকে খাইয়ে দেয় ।
গোরু - বলদেরা রক্ষকহীন অবস্থাতেই আশ্রমে ফিরে এল । দেবযানী দেখলেন গো - বলদ এলেও , কচ ফিরলোনা । তখন সে পিতা শুক্রাচার্যের কাছে গিয়ে বলল- ‘পিতা ! আপনি সন্ধ্যা - পূজা সমাপন করেছেন , সূর্যাস্ত হয়ে গেছে , গো - বলদ আশ্রমে ফিরে এসেছে কিন্তু কচ কোথায় , সে তো আসেনি ? তাকে নিশ্চয়ই কেউ হত্যা করেছে বা সে নিজেই মারা গেছে । পিতা ! আমি আপনার কাছে শপথ করে বলছি আমি কচকে ছাড়া বাঁচব না’ । শুক্রাচার্য বললেন , ‘তুমি এত ভয় পাচ্ছ । কেন ? আমি এখনই ওকে জীবিত করে দেব’ । শুক্রাচার্য সঞ্জীবনী বিদ্যা প্রয়োগ করে কচকে ডাকলেন — ‘ পুত্র , এসো’ । কচের শরীরের এক একটি অংশ শৃগাল ও নেকড়ের শরীর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে বেরিয়ে এলো এবং কচ জীবিত হয়ে শুক্রাচার্যের সেবার জন্য উপস্থিত হলেন । দেবযানী জিজ্ঞাসা করায় কচ তাকে সমস্ত কথা জানালেন ।
এরপর অসুরেরা অন্য এক নতুন উপায় বার করল । তারা কচকে টুকরো টুকরো করে কেটে আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম করে সেই ভস্ম সুরাতে মিশিয়ে শুক্রাচার্যকে পান করাল । দেবযানী পিতার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন ‘ পিতা ! কচ যে ফুল আনতে গিয়েছিল , এখনও ফিরে আসেনি । তাকে আবার হত্যা করা হয়নি তো ? তাকে ছাড়া আমি বাঁচব না । ' শুক্রাচার্য বললেন— ‘মা , আমি কি করি বল ? অসুরেরা বার বার তাকে মেরে ফেলছে’ । দেবযানী অনুনয় করায় তিনি পুনরায় সঞ্জীবনী বিদ্যা প্রয়োগ করে কচকে ডাকলেন । কচ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে শুক্রাচার্যের পেটের মধ্যে থেকে আস্তে আস্তে তার অবস্থান জানালেন । শুক্রাচার্য তাঁকে বললেন — ‘পুত্র ! তোমার সিদ্ধিলাভ হোক্ । দেবযানী তোমার ওপর অত্যন্ত প্রসন্ন । তুমি ইন্দ্র নও , ব্রাহ্মণ । তাই তোমাকে আমি সঞ্জীবনী বিদ্যা প্রদান করছি , তুমি গ্রহণ করো এবং আমার পেট থেকে বেরিয়ে এসো । তুমি আমার পেটের মধ্যে আছ , তাই তুমি আমার পুত্রের মতো । সুযোগ্য পুত্রের মতোই তুমি বেরিয়ে এসে সঞ্জীবনী মন্ত্রের সাহায্যে আমাকে পুনরায় জীবিত করে দিও’ ।
কচ শুক্রাচার্যের নির্দেশ মতো পেট থেকে বেরিয়ে এলেন এবং শুক্রাচার্যকে জীবিত করলেন । কচ শুক্রাচার্যকে প্রণাম করে বললেন— “ যিনি আমাকে সঞ্জীবনী বিদ্যারূপ অমৃতধারা প্রদান করেছেন , তিনিই আমার মাতা - পিতা । আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ । আমি কখনো আপনার সঙ্গে অকৃতজ্ঞতার কাজ করব না । যে ব্যক্তি বেদস্বরূপ উত্তম জ্ঞানদাতা গুরুর সম্মান করে না , সে কলঙ্কভাগী হয় এবং নরকে গমন করে |
শুক্রাচার্য যখন জানতে পারলেন যে , তাকে ছলনা করে কচের ভস্ম - সহ সুরা পান করানো হয়েছিল , তখন তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ঘোষণা করলেন — এখন থেকে জগতে কোনো ব্রাহ্মণ যদি সুরা পান করেন , তাহলে তিনি ধর্মভ্রষ্ট হবেন এবং তার ব্রহ্মহত্যার পাপ হবে । ইহলোকে সে কলঙ্কিত তো হবেই , পরলোকেও কিছু পাবে না । হে ব্রাহ্মণ , দেবগণ এবং মনুর সন্তান ! সতর্ক হয়ে শোনো, আজ থেকে আমি ব্রাহ্মণদের ধর্ম এবং মর্যাদা সুনিশ্চিত করে দিলাম । কচ সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ করে সহস্র বৎসর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তার কাছেই ছিলেন । সময় পূর্ণ হলে শুক্রাচার্য তাকে স্বর্গে যাবার আদেশ দেন ।
কচ যখন সেখান থেকে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত তখন দেবাযানী কচকে বললেন— ‘ঋষিকুমার ! তুমি সদাচার , কৌলিন্য , বিদ্যা , তপস্যা এবং জিতেন্দ্রিয়তার উজ্জ্বল আদর্শ । আমি তোমার পিতাকে নিজের পিতার মতো মান্য করেছি । গুরু - গৃহে থাকাকালীন তোমার সঙ্গে আমি যে ব্যবহার করেছি তা বলার প্রয়োজন নেই । এখন তুমি স্নাতক হয়েছো ; আমি তোমাকে ভালোবাসি , তোমার সেবিকা । তুমি আমাকে বিধিসম্মতভাবে বিবাহ করো’ । কচ বললেন— ‘ ভগিনী ! ভগবান শুক্রাচার্য তোমার মতো আমারও পিতা । তুমি আমার পূজনীয়া । যে গুরুদেবের শরীর থেকে তোমার জন্ম , তার শরীরে আমিও বাস করেছি । ধর্ম অনুসারে তুমি আমার ভগ্নী । আমি তোমার স্নেহপূর্ণ ছত্রছায়ায় অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে ছিলাম । আমাকে এ গৃহে ফিরে যাবার অনুমতি দাও ও আশীর্বাদ করো । মাঝে মাঝে আমার কথা স্মরণ কোরো এবং সাবধানে আমার গুরুদেবের সেবা কোরো’ । দেবযানী বললেন- ‘কচ ,আমি তোমার কাছে প্রেম - ভিক্ষা করেছিলাম । তুমি যদি ধর্ম এবং কামসিদ্ধির উদ্দেশ্যে আমাকে অস্বীকার করো তাহলে তোমার এই সঞ্জীবনী বিদ্যা সিদ্ধ হবে না’ ।
কচ বললেন— ‘ভগ্নী ! আমি গুরুকন্যা বলেই তোমাকে অস্বীকার করেছি , কোনো দোষের জন্য নয় । গুরুদেবও আমাকে তেমন কোনো নির্দেশ দেননি । তোমার যদি ইচ্ছা হয় , আমাকে অভিশাপ দাও । আমি তোমাকে ঋষিধর্মের কথাই বলেছি । আমি তোমার শাপের যোগ্য নই’ । তবুও দেবযানী কচকে শাপ দেওয়ায় কচ বললেন , ‘তুমি ধর্ম অনুসারে নয় , কামবশত শাপ দিয়েছ ; তোমার কামনা কখনো পূর্ণ হবে না । কোনো ব্রাহ্মণকুমার তোমার পাণিগ্রহণ করবেন না । আমার বিদ্যা সফল না হলে কী হবে , আমি যাকে শেখাব , তার বিদ্যা তো সফল হবে’ ! -এই কথা বলে কচ স্বর্গে চলে গেলেন । দেবতাগণ তাদের গুরু বৃহস্পতি এবং তার পুত্র কচকে অভিনন্দন জানালেন , কচকে যজ্ঞের হোতা করলেন এবং যশস্বী হবার বর দিলেন ।
-------------------------------- ----------------------------------------------

No comments:
Post a Comment