Wednesday, September 23, 2020

Biography of Kach and Devyani in Mahabharata


মহাভারতের কচ ও দেবযানী বৃত্তান্ত

     

            পুরাকালে  দেবতা এবং অসুরগণ ত্রিলোকের অধিকার পাবার জন্য নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করছিলেনবিজয়লাভের জন্য দেবতারা আঙ্গিরস বৃহস্পতিকে এবং অসুরেরা ভার্গব শুক্রকে নিজ নিজ গুরুরূপে বরণ করেনএই দুই ব্রাহ্মণও নিজেদের মধ্যে একে অপরকে অতিক্রম করার চেষ্টা করতেন

         যুদ্ধে যখন দেবতারা অসুরদের বধ করেছিলেন , তখন শুক্রাচার্য তাঁর বিদ্যার সাহায্যে তাঁদের জীবিত করেছিলেনকিন্তু অসুরেরা যে দেবতাদের মেরে ফেলেছিলেন , তাদের  বৃহস্পতি জীবিত করতে পারেননিকেননা  শুক্রাচার্য  সঞ্জীবনী মন্ত্র জানতেন ,কিন্তু বৃহস্পতি জানতেন নাএতে দেবতাগণ খুব দুঃখিত হয়েছিলেন

        তাঁরা ভয় পেয়ে  বৃহস্পতির জ্যেষ্ঠ পুত্র কচের কাছে গিয়ে তাঁকে অনুরোধ করেন , “ ভগবান্ ! আমরা আপনার শরণাগতআপনি আমাদের সাহায্য করুনঅমিত তেজস্বী বিপ্রবর শুক্রাচার্য যে সঞ্জীবনী বিদ্যা জানেন , আপনি সেই বিদ্যা  শীঘ্রই আয়ত্ত করুন ; আমরা আপনাকে যজ্ঞের ভাগীদার  করে নেব

       সেই সময় শুক্রাচার্য বৃষপর্বার নিকটে ছিলেনদেবতাদের অনুরোধে কচ শুক্রাচার্যের কাছে গিয়ে আবেদন করলেন-“ আমি মহর্ষি অঙ্গিরার পৌত্র এবং দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ , আপনি আমাকে আপনার শিষ্য করুন  , আমি সহস্র বৎসর আপনার কাছে থেকে ব্রহ্মচর্য পালন পূর্বক সেবা করবশুক্রাচার্য বললেন - ‘ স্বাগত পুত্র ! আমি তোমার আবেদন স্বীকার করছিআমি তোমার সৎকার  করব , কেন - না তোমাকে সৎকার করলে দেবগুরু বৃহস্পতিকেই সৎকার করা হবে বলে আমি মনে করিকচ শুক্রাচার্যের নির্দেশানুসারে ব্রহ্মচর্যব্রত গ্রহণ করলেন

        তিনি গুরুকে  প্রসন্ন রাখার পাশাপাশি  গুরুকন্যা দেবযানীকেও খুশি রাখতেনপাঁচশত বৎসর অতিক্রান্ত হবার পর দানবেরা কচের  অভিপ্রায় জানতে পারলতারা ক্রুদ্ধ হয়ে গোচারণের সময় বৃহস্পতির ওপর দ্বেষবশত এবং সঞ্জীবনী বিদ্যা রক্ষার অভিপ্রায়ে কচকে মেরে টুকরো টুকরো করে নেকড়ে বাঘকে খাইয়ে দেয়  ।

       গোরু - বলদেরা রক্ষকহীন অবস্থাতেই আশ্রমে ফিরে এলদেবযানী দেখলেন গো - বলদ এলেও , কচ ফিরলোনাতখন সে পিতা শুক্রাচার্যের কাছে গিয়ে বলল- ‘পিতা ! আপনি সন্ধ্যা - পূজা সমাপন করেছেন , সূর্যাস্ত হয়ে গেছে , গো - বলদ আশ্রমে ফিরে এসেছে কিন্তু কচ কোথায় , সে তো আসেনি ? তাকে নিশ্চয়ই কেউ হত্যা করেছে বা সে নিজেই মারা গেছেপিতা ! আমি আপনার কাছে শপথ করে বলছি আমি কচকে ছাড়া বাঁচব না’ ।  শুক্রাচার্য বললেন , তুমি এত ভয় পাচ্ছকেন ? আমি এখনই ওকে জীবিত করে দেব’ ।  শুক্রাচার্য সঞ্জীবনী বিদ্যা প্রয়োগ করে কচকে ডাকলেন — ‘ পুত্র , এসো’ । কচের শরীরের এক একটি অংশ শৃগাল নেকড়ের শরীর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে বেরিয়ে এলো এবং কচ জীবিত হয়ে শুক্রাচার্যের সেবার জন্য উপস্থিত হলেনদেবযানী জিজ্ঞাসা করায় কচ তাকে সমস্ত কথা জানালেন

         এরপর  অসুরেরা অন্য এক নতুন উপায় বার করলতারা কচকে টুকরো টুকরো করে কেটে আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম করে সেই ভস্ম সুরাতে মিশিয়ে শুক্রাচার্যকে পান করালদেবযানী পিতার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেনপিতা ! কচ যে ফুল আনতে গিয়েছিল , এখনও ফিরে আসেনিতাকে আবার হত্যা করা হয়নি তো ? তাকে ছাড়া আমি বাঁচব না' শুক্রাচার্য বললেন— ‘মা , আমি কি করি বল ? অসুরেরা বার বার তাকে মেরে ফেলছে’ । দেবযানী অনুনয় করায় তিনি পুনরায় সঞ্জীবনী বিদ্যা প্রয়োগ করে কচকে ডাকলেনকচ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে শুক্রাচার্যের পেটের মধ্যে থেকে আস্তে আস্তে তার অবস্থান জানালেনশুক্রাচার্য তাঁকে বললেন — ‘পুত্র ! তোমার সিদ্ধিলাভ হোক্দেবযানী তোমার ওপর অত্যন্ত প্রসন্নতুমি ইন্দ্র নও , ব্রাহ্মণতাই তোমাকে আমি সঞ্জীবনী বিদ্যা প্রদান  করছি , তুমি গ্রহণ করো এবং আমার পেট থেকে বেরিয়ে এসোতুমি আমার পেটের মধ্যে আছ , তাই তুমি আমার পুত্রের মতোসুযোগ্য পুত্রের মতোই তুমি বেরিয়ে এসে সঞ্জীবনী মন্ত্রের সাহায্যে আমাকে পুনরায় জীবিত করে দিও’ ।

        কচ শুক্রাচার্যের নির্দেশ মতো পেট থেকে বেরিয়ে এলেন এবং শুক্রাচার্যকে জীবিত করলেনকচ শুক্রাচার্যকে প্রণাম করে বললেন— “ যিনি আমাকে সঞ্জীবনী বিদ্যারূপ অমৃতধারা প্রদান করেছেন , তিনিই আমার মাতা - পিতাআমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞআমি কখনো আপনার সঙ্গে অকৃতজ্ঞতার কাজ করব নাযে ব্যক্তি বেদস্বরূপ উত্তম জ্ঞানদাতা গুরুর সম্মান করে না , সে কলঙ্কভাগী হয় এবং নরকে গমন করে |

          শুক্রাচার্য যখন জানতে পারলেন যে , তাকে ছলনা করে কচের ভস্ম - সহ সুরা পান করানো হয়েছিল , তখন তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ঘোষণা করলেনএখন থেকে জগতে কোনো ব্রাহ্মণ যদি সুরা পান করেন , তাহলে তিনি ধর্মভ্রষ্ট হবেন এবং তার ব্রহ্মহত্যার পাপ হবেইহলোকে সে কলঙ্কিত তো হবেই , পরলোকেও কিছু পাবে নাহে ব্রাহ্মণ , দেবগণ এবং মনুর সন্তান ! সতর্ক হয়ে শোনো, আজ থেকে আমি ব্রাহ্মণদের ধর্ম এবং মর্যাদা সুনিশ্চিত করে দিলামকচ সঞ্জীবনী বিদ্যা লাভ করে সহস্র বৎসর পূর্ণ  হওয়া পর্যন্ত তার কাছেই ছিলেনসময় পূর্ণ হলে শুক্রাচার্য তাকে স্বর্গে যাবার আদেশ দেন

        কচ যখন সেখান থেকে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত তখন দেবাযানী কচকে বললেন— ‘ঋষিকুমার ! তুমি সদাচার , কৌলিন্য , বিদ্যা , তপস্যা এবং জিতেন্দ্রিয়তার উজ্জ্বল  আদর্শআমি তোমার পিতাকে নিজের পিতার মতো মান্য করেছিগুরু - গৃহে থাকাকালীন তোমার সঙ্গে আমি যে ব্যবহার করেছি তা বলার প্রয়োজন নেইএখন তুমি স্নাতক হয়েছো ; আমি তোমাকে ভালোবাসি , তোমার সেবিকাতুমি আমাকে বিধিসম্মতভাবে বিবাহ করো’ । কচ বললেন— ‘ ভগিনী ! ভগবান শুক্রাচার্য তোমার মতো আমারও পিতাতুমি আমার পূজনীয়াযে গুরুদেবের শরীর থেকে তোমার জন্ম , তার শরীরে আমিও বাস করেছিধর্ম অনুসারে তুমি আমার ভগ্নীআমি তোমার স্নেহপূর্ণ ছত্রছায়ায় অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে ছিলামআমাকে গৃহে ফিরে যাবার অনুমতি দাও আশীর্বাদ করোমাঝে  মাঝে আমার কথা স্মরণ কোরো এবং সাবধানে আমার গুরুদেবের সেবা কোরো’ । দেবযানী বললেন- ‘কচ ,আমি তোমার কাছে প্রেম - ভিক্ষা করেছিলামতুমি যদি ধর্ম এবং কামসিদ্ধির উদ্দেশ্যে আমাকে অস্বীকার করো তাহলে  তোমার এই সঞ্জীবনী বিদ্যা সিদ্ধ হবে না’ । 

      কচ বললেন—  ‘ভগ্নী ! আমি গুরুকন্যা বলেই তোমাকে অস্বীকার করেছি ,  কোনো দোষের জন্য নয়গুরুদেবও আমাকে তেমন  কোনো নির্দেশ দেননিতোমার যদি ইচ্ছা হয় , আমাকে অভিশাপ দাওআমি তোমাকে ঋষিধর্মের কথাই বলেছিআমি তোমার শাপের যোগ্য নই’ । তবুও দেবযানী  কচকে শাপ দেওয়ায় কচ বললেন , তুমি ধর্ম অনুসারে  নয় , কামবশত শাপ দিয়েছ ; তোমার কামনা কখনো পূর্ণ হবে নাকোনো ব্রাহ্মণকুমার তোমার পাণিগ্রহণ  করবেন নাআমার বিদ্যা সফল না হলে কী হবে , আমি যাকে শেখাব , তার বিদ্যা তো সফল হবে’ ! -এই কথা  বলে কচ স্বর্গে চলে গেলেনদেবতাগণ তাদের গুরু  বৃহস্পতি এবং তার পুত্র কচকে অভিনন্দন জানালেন ,  কচকে যজ্ঞের হোতা করলেন এবং যশস্বী হবার বর  দিলেন

-------------------------------- ----------------------------------------------   

 

 

No comments:

Post a Comment