ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের জন্ম বৃত্তান্ত
মহর্ষি বৈশম্পায়নের
কথনানুসারে-মহর্ষি ব্যাস একবার হস্তিনাপুরে গান্ধারীর কাছে এলেন এবং গান্ধারীর সেবা-যত্নে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে গান্ধারীকে বর চাইতে
বললেন । তাঁর পতির ন্যায় বলশালী একশত পুত্র হওয়ার বর চাইলেন গান্ধারী । ফলস্বরূপ
গান্ধারী গর্ভধারণ করল | কিন্তু দুবছর
পর্যন্ত সময় অতিবাহিত হলেও গর্ভস্থ সন্তান জন্মই নিল না ।
ইতিমধ্যে কুন্তীপুত্র
যুধিষ্ঠির ভূমিষ্ঠ হন | নারী-স্বভাববশতঃ
গান্ধারী দুঃখিত হয়ে ধৃতরাষ্ট্রের অজ্ঞাতে গর্ভপাত করান এবং
তাঁর পেট থেকে লৌহপিণ্ডের ন্যায় এক মাংসপিণ্ড
বেরিয়ে আসে । দুবছর গর্ভধারণ করার পরও ওই অবস্থায় দেখে গান্ধারী সেই মাংসপিণ্ড
পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন |
ভগবান ব্যাস যোগদৃষ্টিতে সব জানতে পেরে সেখানে এসে বললেন
-‘পুত্রী ! তুমি এ কী কাজ করছ’ ? গান্ধারী
ব্যাসদেবকে সব কথা জানিয়ে বললেন- ‘ভগবান ! আপনার আশীর্বাদে আমি আগে গর্ভধারণ
করলেও কুন্তীর পুত্র প্রথমে ভূমিষ্ঠ হয়েছে । দুবছর গর্ভধারণ করার পর একশত পুত্রের
পরিবর্তে এই মাংসপিণ্ডটি ভূমিষ্ঠ হয়েছে , এ | কী হল’ ?
ব্যাসদেব বললেন- ‘আমার বরের অন্যথা হবে না , আমি পরিহাস করেও কখনো মিথ্যা কথা বলি না । | এখন
তুমি শীঘ্র একশতটি কুণ্ড ঘি দিয়ে পূর্ণ করো এবং সুরক্ষিত স্থানে সেটি রেখে এই
মাংস পিণ্ডে ঠাণ্ডা জল ছেটাও’| ঠাণ্ডা জল দেওয়াতে পিণ্ডটি একশত টুকরো হল ।
প্রত্যেকটি টুকরো একটি আঙুলের গাঁটের সমান । তাতে আর একটি টুকরো বেশি ছিল ।
ব্যাসদেবের নির্দেশানুসারে
সমস্ত টুকরোগুলি সেই ঘৃতকুণ্ডগুলিতে রাখা হল । দুবৎসর পরে সেগুলো খোলার নির্দেশ দিয়ে তিনি তপস্যা
করতে হিমালয়ে চলে গেলেন । দুবছর পর সেই মাংস পিণ্ড হতে প্রথমে দুর্যোধন ও পরে অন্য
পুত্রেরা জন্ম নেন । দুর্যোধন যেদিন জন্ম নিলেন
, সেই
দিনই প্রবল পরাক্রমশালী ভীমসেনও ভূমিষ্ঠ হন ।
দুর্যোধন জন্মের সাথে সাথেই গর্দভের সুরে ডাকতে লাগলেন । সেই আওয়াজে
গর্দভ , শিয়াল
এবং কাক ডাকতে লাগল , ঝড় উঠল , কয়েক স্থানে আগুন লেগে গেল । এইসব শুনে
ধৃতরাষ্ট্র অত্যন্ত ভীত হয়ে ব্রাহ্মণ , ভীষ্ম , বিদুর এবং আত্মীয় পরিজন ও কুরুকুলের প্রধান
ব্যক্তিদের ডেকে বললেন- ‘আমাদের বংশে পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠিরই জ্যেষ্ঠ রাজপুত্র ।
নানাগুণের জন্য সে তো রাজা হবেই , তার সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই , কিন্তু
তারপরে আমার পুত্র রাজা হবে কি না , তা
আপনারা বলুন । ' ধৃতরাষ্ট্রের কথা শেষ হওয়ার আগেই মাংসভোজী শিয়ালের দল ডেকে উঠল |
চতুর্দিকে
অমঙ্গলসূচক অশুভ ইঙ্গিত দেখে ব্রাহ্মণদের
সঙ্গে বিদুর বললেন-‘রাজন্ ! আপনার জ্যেষ্ঠ
পুত্রের জন্মের সময় যেরূপ অশুভ লক্ষণ
দেখা যাচ্ছে , তাতে মনে হচ্ছে যে আপনার এই পুত্র কুলনাশক হবে । তাই একে ত্যাগ করা
উচিত । একে পালন করলে দুঃখই বাড়বে । আপনি
যদি বংশের কল্যাণ চান তাহলে একশতের মধ্যে
একজনকে ত্যাগ করাই ভালো , এই মনে করে একে ত্যাগ করুন এবং নিজ কুল ও জগতের
মঙ্গলসাধন করুন । শাস্ত্র স্পষ্ট ভাষায় বলেছে যে , সমস্ত
কুলের জন্য একজন মানুষ , সমস্ত গ্রামের তীর জন্য একটি কুল এবং দেশের জন্য
একটি গ্রাম এবং আত্মকল্যাণের জন্য পৃথিবীই
পরিত্যাগ করা কর্তব্য’।
সকলে একত্র
হয়ে ধৃতরাষ্ট্রকে অনেক বোঝালেও পুত্রস্নেহবশতঃ রাজা ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে
ত্যাগ করতে পারলেন না । সেই একশত এক টুকরো
মাংসপিণ্ড থেকে একশত পুত্র এবং একটি কন্যার জন্ম হয় ।
গান্ধারী গর্ভবতী জল থাকার সময়
এক বৈশ্য-কন্যা ধৃতরাষ্ট্রের সেবা করত , তার গর্ভে যুযুৎসু নামক ধৃতরাষ্ট্রের এক পুত্র
জন্ম নেন । সেই পুত্র অত্যন্ত যশস্বী ও বিচারশীল ছিলেন |
ধৃতরাষ্ট্রের একশত পুত্রের নাম
মহাভারত বর্ণিত ধৃতরাষ্ট্রের
একশত পুত্রের নাম হল-দুর্যোধন , দুঃশাসন , দুস্সহ , দুশ্শল , জলসন্ধ , সম , সহ , বিন্দ , অনুবিন্দ , দুর্দ্ধর্ষ , সুবাহু , দুষ্প্রধর্ষণ , দুর্মর্ষণ , দুর্মুখ , দুষ্কর্ণ
, কর্ণ , বিবিংশতি
, বিকর্ণ
, শল , সত্য , সুলোচন
, চিত্র , উপচিত্র
, চিত্রাক্ষ
, চারুচিত্র
, শরাসন , দুর্মদ
, দুর্বিগাহ
, বিবিৎসু
, বিকটানন
, উর্ণনাভ
, সুনাভ , নন্দ , উপনন্দ
, চিত্রবাণ
, চিত্রবর্মা
, সুবর্মা
, দুর্বিমোচন
, আয়োবাহু
, মহাবাহু
, চিত্রাঙ্গ
, চিত্রকুণ্ডল
, ভীমবেগ
, ভীমবল , বলাকী , বলবর্ধন
, উগ্ৰায়ুধ
, সুষেণ , কুণ্ডধার
, মহোদর , চিত্রায়ুধ
, নিষঙ্গী
, পাশী , বৃন্দারক
, দৃঢ়বৰ্মা
, দৃঢ়ক্ষত্র
, সোমকীর্তি
, অনূদর , দৃঢ়সন্ধ
,জরাসন্ধ
, সত্যসন্ধ
, সদঃসুবাক
, উগ্রশ্রবা
, উগ্রসেন
, সেনানী
, দুষ্পরাজয়
, অপরাজিত
, কুণ্ডশায়ী
, বিশালাক্ষ
, দুরাধর
, দৃঢ়হস্ত
, সুহস্ত
, বাতবেগ
, সুবর্চা
, আদিত্যকেতু
, বহ্বাশী
, নাগদত্ত
, অগ্রযায়ী
, কবচী , ক্ৰথন , কুণ্ডী
, উগ্র , ভীমরথ , বীরবাহু
, অলোলুপ
, অভয় , রৌদ্রকর্মা
, দৃঢ়থাশ্রয়
, অনাধৃষ্য
, কুণ্ডভেদী
, বিরাবী
, প্রমথ , প্রমাথী
, দীর্ঘরোমা
, দীর্ঘবাহু
, মহাবাহু
, ব্যঢ়োরস্ক
, কনকধ্বজ
, কুণ্ডাশী
এবং বিরজা ।
ধৃতরাষ্ট্রের একমাত্র কন্যার
নাম ছিল দুঃশলা । ধৃতরাষ্ট্রের
সমস্ত পুত্রই ছিল বীর , যুদ্ধকুশল
এবং শাস্ত্রজ্ঞ । ধৃতরাষ্ট্র যথাযোগ্য সময়ে সুন্দরী কন্যাদের সঙ্গে পুত্রদের বিবাহ সম্পন্ন করেন । রাজা জয়দ্রথের সঙ্গে কন্যা
দুঃশলার বিবাহ হয় ।

No comments:
Post a Comment