কৃপাচার্য ,দ্রোণাচার্য ও অশ্বত্থামার জন্ম কাহিনী
কৃপাচার্যের জন্ম কাহিনী:-
বৈশম্পায়ন মুখে কথিত বৃত্তান্ত অনুসারে , মহর্ষি গৌতমের পুত্র ছিলেন শরদ্বান । তিনি বাণের দ্বারা উৎপন্ন হয়েছিলেন । ধনুর্বেদে তিনি ছিলেন মনোযোগী । তিনি তপস্যা দ্বারা সমস্ত অস্ত্র - শস্ত্র লাভ করেছিলেন । শরদ্বানের ভীষণ তপস্যা এবং ধনুর্বেদে নৈপুণ্য দেখে ইন্দ্র অত্যন্ত ভীত হয়েছিলেন । তিনি শরদ্বানের তপস্যায় ব্যাঘাত করার জন্য জানপদী নামে এক দেবকন্যা প্রেরণ করেন । তিনি শরদ্বানের আশ্রমে এসে নানাভাবে তাকে প্রলোভিত করতে থাকেন । সেই সুন্দরী যুবতীকে এক বস্ত্রে দেখে তিনি রোমাঞ্চিত হন , হাত থেকে ধনুর্বাণ পড়ে যায় ।
শরদ্বান অত্যন্ত বিবেচক এবং তপস্যার পক্ষপাতী ছিলেন । তিনি ধৈর্য সহকারে নিজেকে দমন করলেন । কিন্তু তাঁর মনে বিকার আসায় অজান্তেই তাঁর শুক্রপাত হয় । তিনি ধনুর্বাণ , মৃগচর্ম , আশ্রম ও সেই কন্যাকে পরিত্যাগ করে সত্বর সেখান থেকে রওনা হলেন । তার বীর্য সরকণ্ডোর ওপরে পড়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে একটি কন্যা ও একটি পুত্রের জন্ম হল ।
দৈবক্রমে রাজর্ষি শান্তনু সপারিষদ শিকার করতে সেখানে এলেন ।কোনো এক পারিষদ সেইদিকে তাকিয়ে শিশুদের দেখল এবং ভাবল যে , এই শিশুদ্বয় হয়তো কোনো ধনুর্বেদে পারদর্শী ব্রাহ্মণপুত্র । রাজা শান্তনু সংবাদ পেয়ে সেই শিশুদের সঙ্গে নিয়ে এসে পালন - পোষণ করে যথোচিত সংস্কার করলেন এবং দুজনের নাম রাখলেন কৃপ এবং কৃপী ।
শরদ্বান তপপ্রভাবে সব জানতে পেরে রাজর্ষি শান্তনুর কাছে এসে তাঁদের নাম - গোত্র জানালেন এবং তাদের চার প্রকার ধনুর্বেদ ও বিবিধ শাস্ত্রাদির শিক্ষা দিলেন । অল্প দিনেই বালক কৃপ সকল বিষয়ে পারঙ্গম হয়ে উঠলেন এবং কৌরব , পাণ্ডব , যদুবংশীয় ও অন্যান্য রাজকুমারদের ধনুর্বেদ অভ্যাস করাতে লাগলেন ।
দ্রোণাচার্য ও অশ্বত্থামার জন্ম কাহিনী:-
প্রথম যুগে গঙ্গাদ্বার নামক স্থানে মহর্ষি ভরদ্বাজ বাস করতেন । তিনি অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ এবং যশস্বী ছিলেন । একবার যজ্ঞের সময় তিনি মহর্ষিদের নিয়ে গঙ্গাস্নানে গেলেন । সেখানে ঘৃতাচী অপ্সরাকে স্নান করতে দেখে তাঁর মনে কামনা জাগরিত হয় এবং তাঁর বীর্যস্খলন হয় । তিনি সেই বীর্য দ্রোণ নামক যজ্ঞপাত্রে রেখে দেন , তাতেই দ্রোণ জন্ম নেন । দ্রোণ সমগ্র বেদ ও বেদাঙ্গ স্বাধ্যায় করেছিলেন । মহর্ষি ভরদ্বাজ আগেই অগ্নিরেশ্যকে আগ্নেয়াস্ত্র শিক্ষা প্রদান করেছিলেন । গুরু ভরদ্বাজের নির্দেশে তিনি দ্রোণকে আগ্নেয়াস্ত্র শিক্ষা দেন । জামদায় পৃষৎ নামের এক রাজা ছিলেন ভরদ্বাজ মুনির মিত্র । দ্রোণের জন্মের সময়ই তার এক পুত্র হয় তার নাম দ্রুপদ । তিনিও ভরদ্বাজ আশ্রমে এসে দ্রোণের সঙ্গে শিক্ষালাত করেন । দ্রোণের সঙ্গে তার অত্যন্ত বন্ধুত্ব হয় । পৃষতের মৃত্যুর পর দ্রুপদ উত্তর - পাঞ্চাল দেশের রাজা হলেন ।
ভরদ্বাজ ঋষি ব্রহ্মলীন হলে দ্রোণ আশ্রমে থেকে তপস্যায় রত হন । তিনি শরদ্বানের কন্যা কৃপীকে বিবাহ করেন । কৃপী অত্যন্ত ধর্মশীলা এবং জিতেন্দ্রিয়া ছিলেন । অশ্বত্থামা কৃপীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি জন্মেই উচ্চৈঃশ্রবা অশ্বের ন্যায় ‘স্থাম’ অর্থাৎ শব্দ করেছিলেন , তাই তার নাম রাখা হয় ‘ অশ্বত্থামা । অশ্বত্থামার জন্মে দ্রোণ অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং স্বয়ং অশ্বত্থামাকে ধনুর্বেদ শিক্ষা দিতে থাকেন ।
একসময় দ্রোণাচার্য জানতে পারেন যে,জামদগ্নি নন্দন ভগবান পরশুরাম তার সর্বস্ব ব্রাহ্মণদের দান করছেন | দ্রোণাচার্য তার কাছ থেকে ধনুর্বেদ সমন্ধীয় জ্ঞান এবং দিব্য অস্ত্রাদি সম্পর্কে জানার জন্য রওনা দিলেন |শিষ্যাদিসহ মহেন্দ্র পর্বতে পৌঁছে তিনি পরশুরামকে প্রণাম করে বললেন— “ আমি মহর্ষি অঙ্গিরার গোত্রে ভরদ্বাজ ঋষির দ্বারা অযোনি সম্ভূত পুত্র । আমি আপনার কাছে কিছু পাবার আশায় এসেছি ।
পরশুরাম বললেন— “ আমার কাছে যা ধন - রত্ন ছিল , তা আমি ব্রাহ্মণদের দিয়ে দিয়েছি । সমস্ত পৃথিবী আমি ঋষি কাশ্যপকে প্রদান করেছি । আমার কাছে এখন এই শরীর ও অস্ত্র ব্যতীত আর কিছুই নেই । এর মধ্যে যেটি তোমার প্রয়োজন চেয়ে নাও । দ্রোণাচার্য । বললেন— “ ভৃগুনন্দন ! আপনি আমাকে সমস্ত অস্ত্র , তার প্রয়োগ , রহস্য এবং উপসংহার বিধি - সহ প্রদান করুন । পরশুরাম তথাস্তু ’ বলে তাকে সমস্ত শিক্ষা - সহ অস্ত্র দিলেন । অস্ত্র - শস্ত্র লাভ করে দ্রোণ অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন । তিনি তারপর তার প্রিয় মিত্র দ্রুপদের কাছে ফিরে এলেন । দ্রোণাচার্য দ্রুপদের কাছে গিয়ে বললেন— “ রাজন্ ! আমাকে চিনতে পারছেন ? আমি আপনার প্রিয় সখা দ্রোণ । পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ দ্রোণের কথায় অসন্তুষ্ট হলেন । চক্ষু লাল করে ভ্রু কুঞ্চিত করে বললেন— “ ব্রাহ্মণ ! তোমার কোনো বুদ্ধি নেই ! আমাকে বন্ধু বলতে তোমার একটুও লজ্জা হল না ? গরিবের সঙ্গে রাজার কীসের বন্ধুত্ব ? যদি কখনো হয়ে থাকে , তা এখন অতীত স্মৃতি মাত্র ।
দ্রুপদের কথা শুনে দ্রোণ ক্রোধে কম্পিত হলেন । তিনি মনে মনে এক দৃঢ় সংকল্প করে কুরুবংশের রাজধানী হস্তিনাপুরে এলেন । সেখানে তিনি কিছুদিন কৃপাচার্যের গৃহে আত্মগোপন করে রইলেন ।
দ্রোণাচার্যের নৈপুণ্য:-
একদিন যুধিষ্ঠির ও সকল রাজপুত্র মিলে নগরের বাইরে ময়দানে বল খেলতে গেলেন । অকস্মাৎ বলটি একটি কুয়ার মধ্যে পড়ে গেল । রাজকুমারেরা বহু চেষ্টা করেও বলটি তুলতে পারলেন না । তাঁরা লজ্জায় একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলেন । তখন তাঁরা এক ব্রাহ্মণকে দেখতে পেলেন , যিনি নিত্যকর্ম সবে সমাপ্ত করেছেন । ঈষৎ কৃশকায় , শ্যামলবর্ণের সেই ব্রাহ্মণকে রাজকুমারেরা ঘিরে ধরলেন । রাজকুমারদের বিষণ্ণ মুখ দেখে ব্রাহ্মণ ঈষৎ হাস্যে বললেন— “ তোমাদের ক্ষত্রিয় বল এবং অস্ত্র কৌশলকে ধিক ! তোমরা সকলে মিলেও কুয়া থেকে একটি বল তুলতে পারলে না ! দেখো , আমি তোমাদের বল এবং এই আংটিটিকে এখনই থেকে তুলে আনব । তোমরা আমার খাবার ব্যবস্থা করো । ” এই বলে তিনি তার আংটিকেও কুয়াতে ফেলে দিলেন ।
যুধিষ্ঠির বললেন ‘ ভগবান ! কৃপাচার্যের অনুমতি হলে আপনি সর্বদাই এখানে থেকে পান - ভোজনাদি করতে পারবেন । তখন দ্রোণাচার্য বললেন— “ দেখো , এগুলি কয়েকটি শিক । এগুলি আমি মন্ত্রপূত করে রেখেছি । আমি একটি শিক দিয়ে তোমাদের বলে ছিদ্র করছি , পরে অন্য শিকগুলি একের পর এক সংলগ্ন করে বলটি তুলে আনছি । দ্রোণ এই কথা বলে বল তুলে আনলেন । রাজকুমারেরা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন । তাঁরা বললেন — ‘ ভগবান ! আপনার আংটি বার করুন ! দ্রোণাচার্য বাণ প্রয়োগ করে বাণ - সহ আংটি বার করে আনলেন । রাজকুমারেরা ভীষণ আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগলেন — এমন আশ্চর্য অস্ত্রবিদ্যা আমরা আগে কখনো দেখিনি । আপনি কৃপা করে আপনার পরিচয় দিন , আর বলুন আপনার জন্য আমরা কী করতে পারি । দ্রোণাচার্য বললেন— “ তোমরা এইসব কথা ভীষ্মকে বোলো , আশা করি তিনি আমার স্বরূপ চিনতে পারবেন । রাজকুমারেরা নগরে ফিরে এসে পিতামহ ভীষ্মকে সমস্ত ঘটনা জানালেন । তিনি সব শুনেই বুঝলেন যে , ইনি আর কেউ নন , মহারথী দ্রোণাচার্য । ভীষ্ম তখন ঠিক করলেন এখন থেকে দ্রোণাচার্যই রাজকুমারদের অস্ত্র শিক্ষা দেবেন । তিনি সত্বর গিয়ে দ্রোণাচার্যকে নিয়ে এলেন এবং তাঁর খুব আদর - আপ্যায়ন করলেন ।
দ্রোণাচার্যের হস্তিনাপুরে আসার কারণ:-
ভীষ্ম দ্রোণাচার্যকে হস্তিনাপুরে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে দ্রোণাচার্য জানালেন— “ আমি যখন ব্রহ্মচর্য পালনের সময় শিক্ষালাভ করছিলাম , সেইসময় পাঞ্চাল রাজপুত্র দ্রুপদও আমার সঙ্গে ধনুর্বিদ্যা শিখছিলেন । আমাদের দুজনের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব ছিল । তখন সে আমাকে খুশি করার জন্য বলত , “ আমি যখন রাজা হব তুমি আমার সঙ্গে থাকবে । আমি সত্য শপথ করে বলছি আমার রাজ্য , সম্পত্তি এবং সুখ — সবই তোমার হাতে থাকবে । তাঁর প্রতিজ্ঞা স্মরণ করে আমি খুব খুশি এবং আনন্দিত ছিলাম । কিছুদিন পরে আমি শরদ্বানের কন্যা কৃপীকে বিবাহ করি এবং তাঁর গর্ভে সূর্যের ন্যায় তেজস্বী অশ্বত্থামা জন্মগ্রহণ করে । একদিন এক ঋষিকুমার তাঁর গাভীর দুধ পান করছিলেন , তাই দেখে অশ্বত্থামা দুধ খাবার জন্য অত্যন্ত কান্নাকাটি করতে থাকে । তখন আমি চোখে অন্ধকার দেখলাম । কোনো গরিব গোয়ালার কাছ থেকে আমি দুধ নিতে চাইনি , তাতে তাদের ধর্ম - কর্মে বাঁধা পড়বে । অনেক চেষ্টা করেও একটি গাভী আমি জোগাড় করতে পারিনি । ফিরে এসে দেখি ছোট ছোট শিশুরা আটা জলে গুলে অশ্বত্থামাকে দুধ বলে লোভ দেখাচ্ছে আর অশ্বত্থামাও সেটি দুধ মনে করে খেয়ে আনন্দে নাচছে ।
নিজের শিশুকে এইভাবে হাসি - আনন্দ করতে দেখে আমি খুব দুঃখ পেয়েছিলাম । আমি আমার এই দরিদ্র জীবনকে ধিক্কার দিচ্ছিলাম , আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছিল ।‘ হে ভীষ্ম ! আমি যখন শুনলাম আমার প্রিয় সখা দ্রুপদ রাজা হয়েছেন , তখন আমি পত্নী ও পুত্র - সহ আনন্দিত চিত্তে দ্রুপদ রাজার রাজধানী গেলাম , কারণ দ্রুপদের শপথের ওপর আমার বিশ্বাস ছিল । কিন্তু আমি যখন দ্রুপদের কাছে গেলাম , তিনি তখন অপরিচিতের ন্যায় আমাকে বললেন , ‘ ব্রাহ্মণ ! তোমার বুদ্ধি এখনও পরিপক্ক হয়নি এবং লোক - ব্যবহারেও তুমি অনভিজ্ঞ , তুমি কী করে বললে যে আমি তোমার সখা ! সেইসময় তুমি আর আমি দুজনেই সমান সমান ছিলাম , তাই বন্ধুত্ব ছিল । এখন আমি ধনী রাজা আর তুমি গরিব ব্রাহ্মণ ! মিত্রতার দাবি একেবারেই ভুল । তুমি বলছ আমি তোমাকে রাজ্য দেবার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম , আমার তো তেমন কিছু মনে পড়ছে না । যদি চাও এখানে একদিন ভালো করে খাওয়া - দাওয়া করো । ' দ্রুপদের দ্বারা অপমানিত হয়ে আমার অন্তর জ্বলে যাচ্ছে । সেখান থেকে চলে আসার সময় আমি প্রতিজ্ঞা করেছি এবং আমার প্রতিজ্ঞা শীঘ্রই পূর্ণ করব । আমি গুণবান শিষ্যদের শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যেই এখানে এসেছি । আপনি আমার কাছে কী আশা করেন ? আমি আপনার জন্য কী করতে পারি ? পিতামহ ভীষ্ম বললেন— “ আপনি আপনার ধনুকের ছিলা খুলে রাখুন আর এখানে থেকে রাজকুমারদের ধনুর্বাণ এবং অস্ত্রশিক্ষা দিন । কৌরবদের ধন , বৈভব এবং রাজ্য আপনারই । আমরা সকলেই আপনার নির্দেশ - পালনকারী । আপনার শুভাগমন আমাদের পক্ষে সৌভাগ্যজনক হোক ।


No comments:
Post a Comment