K.U SEM-III,C-7,SEC-D
Śāḍgunya’Policy of War and Peace
ষাড়গুণ্য নীতি
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে ষড়বিধ পররাষ্ট্রনীতির পরিচয় পাওয়া যায়। কৌটিল্য এই পদ্ধতি বা ব্যবস্থাগুলিকে পররাষ্ট্রনীতির গুণ বলেছেন এবং এ বিষয়ে সম্পর্কিত মতবাদটিকে “ষাড়গুণ্য মতবাদ” বলেছেন । দ্বাদশ রাজমণ্ডল সূত্রেই কৌটিল্য ষাড়গুণ্য মতবাদের অবতারণা করেছেন। এই মতবাদের মাধ্যমে মণ্ডলতত্ত্বের অন্তর্ভুক্ত রাজন্যবর্গের পারস্পরিক সম্পর্কের বিন্যাসগত প্রকারভেদ সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। কৌটিল্য কথিত ষাড়গুণ্যগুলি হল -(১) সন্ধি (শান্তি),(২) বিগ্রহ (যুদ্ধ), (৩) আসন (নিরপেক্ষতা), (৪) যান (অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি) (৫) সংশ্রয় (আত্মরক্ষার আশ্রয়)এবং(৬) দ্বৈধীভাব (দ্বৈতনীতি)|
(১) সন্ধি (শান্তি)-
কৌটিল্যের অভিমত অনুযায়ী সন্ধি হল দু’জন রাজার মধ্যে এক ধরনের পণবন্ধন- ‘তত্র পণবন্ধ: সন্ধি:’। শর্তসাপেক্ষে এই পণবন্ধন সম্পাদিত হয়। সাধারণত কোষ, ভূমি এবং দণ্ড দানের শর্তাদির ভিত্তিতে এই পণবন্ধন ঘটে। কৌটিল্যের মতানুসারে রাজা যদি নিজেকে শত্রুপক্ষের থেকে হীনবল মনে করেন, তা হলে তার উচিৎ সন্ধি সম্পাদন করা। আবার যদি মনে হয় যে যুদ্ধ ও সন্ধি উভয় উপায়েই রাজ্যের সুস্থিতি ও সমৃদ্ধি সাধন সম্ভব, তা হলে রাজার উচিৎ সন্ধির পথ গ্রহণ করা।বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ কৌটিল্য বিজিগীষু রাজার উদ্দেশ্য সাধনের স্বার্থে যে-কোন কৌশল অবলম্বন এবং অনৈতিক বা প্রতারণামূলক পথ গ্রহণের কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে কৌটিল্য সামাজিক ন্যায়-নীতিবোধকে কার্যত উপেক্ষা করেছেন |
(২) বিগ্রহ (যুদ্ধ) -
বিগ্রহ বা যুদ্ধ বলতে শত্রুর বিরুদ্ধে রাজার আক্রমণমূলক আচরণ বা কার্যাবলীকে বোঝায়-‘অপকারো বিগ্রহ:’। কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রের সপ্তম ও দশম অধিকরণে যুদ্ধ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের বিশদভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন।আক্রমণকারী রাজাকে যুদ্ধ আরম্ভ করার আগে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন কৌটিল্য। রাজাকে তাঁর নিজের ও শত্রুর শক্তি-সামর্থ্য ও দুর্বলতার বিভিন্ন দিক,নিজের রাজ্যের সুরক্ষার ব্যাপারেও সুনিশ্চিত হতে হবে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষের থেকে নিজের শক্তি-সামর্থ্যের আধিক্যের ব্যাপারে স্থিরনিশ্চিত হলেই আক্রমণকারী রাজা যুদ্ধে অগ্রসর হবেন |সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজনে বিজিগীষু রাজা তাঁর সমপর্যায়ের বা অধিক শক্তি বা কম শক্তি সম্পন্ন রাজার সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করবেন। কৌটিল্যের আরও অভিমত হল শত্রুপক্ষ যখন বিপদে পড়বে, আভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ-বিদ্রোহে বিপন্ন হবে, দৈব-দুর্বিপাকে হীনবল হবে তখনই হল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার উপযুক্ত সময়।
(৩) আসন (নিরপেক্ষতা)-
‘উপেক্ষণমাসনম্’|‘আসন’ বলতে সন্ধি (শান্তি) ও বিগ্রহ উভয়ের প্রতি উপেক্ষারভাবকে বোঝায়। পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বিষয়েও কৌটিল্য আলোচনা করেছেন। তাঁর মতানুসারে বিশেষ অবস্থায় শত্রর ব্যাপারে নির্লিপ্ত বা নিরপেক্ষতার নীতি অবলম্বন করাই বিজিগীষু রাজার কর্তব্য। তিনি যদি দেখেন যে যুদ্ধে শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করা যাবে না, আবার শত্রুপক্ষও তাঁকে যুদ্ধে পরাস্ত করতে পারবে না, তা হলে যুদ্ধ এবং সন্ধি উভয় বিষয়কেই উপেক্ষা করা আবশ্যক।
(৪)যান(অভিযান)-
‘অভ্যুচ্চয়ো যানম্’|প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রাকে যান বলে |রাজা নিজের রাজ্যের সামগ্রিক বিষয়ে সন্তুষ্ট হলে শত্রুর উদ্দেশ্যে যুদ্ধাভিযান করতে পারেন | রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধির হেতু হল এই যান |
(৫) সংশ্রয় (আত্মরক্ষার আশ্রয়)-
সংশ্রয়ের অর্থ আত্মরক্ষার জন্য আশ্রয় গ্রহণ।এ বিষয়ে কৌটিল্যর অভিমত –‘পরার্পণং সংশ্রয়:’|তাঁর অভিমত অনুসারে আত্মরক্ষার জন্য বিজিগীষু রাজা অধিকতর শক্তিমান বা বিশেষভাবে বলবান রাজার শরণাপন্ন হবেন। এবং এক্ষেত্রে তিনি আত্মরক্ষার জন্য আশ্রয়দাতা রাজার কাছে নিজের স্ত্রীপুত্রাদি, দ্রব্যসামগ্রী সমেত নিজেকে অর্পণ করবেন।এবিষয়ে শ্রী মূলা টীকায় বলা হয়েছে – ‘বলবতে২ন্যস্মৈ রাজ্ঞে স্বাত্মস্বপুত্রস্বদ্রব্যাণামর্পণং সংশ্রয়পদার্থ:’|তবে এই সংশ্রয় হল একটি সাময়িক নীতি বা ব্যবস্থা। শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করতে অসমর্থ বিজিগীষু রাজা নিজের বিপর্যয়রোধ করার জন্য অসহায় অবস্থায় এই পথ অবলম্বন করবেন।
(৬) দ্বৈধীভাব (দ্বৈতনীতি)-
‘সন্ধিবিগ্রহোপাদানং দ্বৈধীভাব:’| দ্বৈধীভাব বা দ্বৈতনীতি হল এক ধরনের কূটকৌশল। এই কৌশল অবলম্বন করে বিজিগীষু রাজা অধিকতর শক্তিমান শত্রুপক্ষের সঙ্গে প্রকাশ্যে সন্ধি করবেন, কিন্তু মনে বৈরীভাব পোষণ করবেন। গোপনে তিনি শত্রুপক্ষের সর্বনাশের সন্ধানে থাকবেন অথবা শক্তিমান দুই শত্রুর একজনের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করবেন এবং অন্যজনের সঙ্গে শত্রুতার নীতি গ্রহণ করবেন। এইভাবে বিজিগীষু রাজা এই পথে নিজের উন্নতি সাধনে উদ্যোগী হবেন।
পররাষ্ট্রনীতির প্রধান উদ্দেশ্য হল নিজ রাজ্যের সমৃদ্ধি ও উন্নতি সাধন। কৌটিল্যের মতানুসারে এই উদ্দেশ্যে বিজিগীষু রাজা শত্রু পক্ষের উন্নয়নমূলক কাজকর্মকে বিনষ্ট করবেন এবং নিজের রাজ্যের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমকে বাস্তবায়িত করার ব্যাপারে বিশেষভাবে যত্নবান হবেন। বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর ষাড়গুণ্যের কোন পদ্ধতি কী রকম প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে বিজিগীষু রাজাকে তা বিচক্ষণতার সঙ্গে বিচার-বিবেচনা করতে হবে এবং তদনুসারে পদ্ধতি বা নীতি নির্ধারণ ও অনুসরণ করতে হবে। যে নীতি হীনবল রাজাকে শক্তির ভারসাম্যে তুলে আনে এবং রাজাকে রাজ্যের সামগ্রিক প্রগতির পথে পরিচালিত করে, যাড়গুণ্যের সেই নীতি সর্বদা গ্রহণ করা বিজিগীষুর পক্ষে বিধেয়।
-----------

এটার যদি সংস্কৃতে টিকা দেওয়া হয় তাহলে ভালো হয়
ReplyDelete