সাংখ্যকারিকা
ঈশ্বরকৃষ্ণ
এক নজরে সাংখ্যকারিকা
·
সাংখ্যদর্শন সর্বপ্রাচীন দর্শন |এই দর্শন নিরীশ্বরবাদী হলেও বেদের অস্তিত্ব স্বীকার করে | তাই এটি আস্তিক দর্শন |
·
মহর্ষি কপিলের প্রশংসা করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন –‘সিদ্ধানাং কপিলো মুনিঃ’ (গীতা-১০/২৬)
·
‘সম্’ উপসর্গপূর্বক ‘খ্যা’(প্রকথনে )ধাতুর উত্তর ‘অঙ্’ প্রত্যয় প্রযুক্ত হওয়ার পর ‘টাপ্’ প্রত্যয় করে ‘সংখ্যা’ শব্দের নিষ্পত্তি |এরপর ‘সংখ্যা’ পদে ‘তস্যেদম্’ সূত্র দ্বারা ‘অণ্’ প্রত্যয় করে ‘সাংখ্য’ পদের নিষ্পত্তি | যার অর্থ ‘গণনার সাথে সম্পর্কিত’ অথবা ‘গণনার মাধ্যমে জানার যোগ্য’ |অতএব যে দর্শন পাঠে সম্যক্ জ্ঞান লাভ করা যায় তাই সাংখ্যদর্শন | এই দর্শনে সংখ্যার গুরুত্ব অত্যধিক |
·
সাংখ্যদর্শনের প্রাচীন মুনি আচার্য কপিল |’জ্ঞানের নিদান আদি বিদ্বান কপিল সাংখ্যকার’ |
·
সাংখ্য ও যোগ সমানতন্ত্র দর্শন |
·
সাংখ্যদর্শনে পঞ্চবিংশতি (২৫ টি )তত্ত্ব স্বীকৃত হয়েছে |
·
সাংখ্যদর্শনানুসারে পুরুষ ও প্রকৃতি –এই দুই হল মুখ্য তত্ত্ব |
·
সাংখ্যদর্শনের প্রমুখাচার্য –কপিল,আসুরি,পঞ্চশিখ ,বিন্ধ্যবাসী ,জৈগীষ্যব,বার্ষগণ্য,ঈশ্বরকৃষ্ণাদি|
·
সাংখ্যদর্শনের প্রমুখ গ্রন্থ –সাংখ্যসূত্র ,ষষ্ঠীতন্ত্র ,রাজবার্তিক ,এপিক সাংখ্য|
·
ঐতিহ্য়ানুসারে কপিলমুনির সাংখ্যসূত্র সাংখ্যদর্শনের প্রথম গ্রন্থ |
·
সাংখ্যসূত্র অতি সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে কপিলমুনি সাংখ্যপ্রবচনসূত্র রচনা করেন |
·
কপিলের দর্শনে ৬০ প্রকারের জ্ঞাতব্য বিষয় থাকায় এই গ্রন্থকে ষষ্ঠীতন্ত্র বলা হয় |
·
সাংখ্যসূত্রেরর প্রমুখ টীকা –অনিরুদ্ধবৃত্তিসার , সাংখ্যবৃত্তিসার , সাংখ্যপ্রবচনভাষ্য ,লঘুসাংখ্যবৃত্তি প্রভৃতি |
·
‘সাংখ্যকারিকা’ সাংখ্যদর্শনের প্রকরণগ্রন্থ | এই গ্রন্থের লেখক ঈশ্বরকৃষ্ণ |
·
ঈশ্বরকৃষ্ণের গুরু পঞ্চশিখ |
·
ঈশ্বরকৃষ্ণের আবির্ভাবকাল বিষয়ে বিদ্বানদের মত হল-জৈনদের ‘অনুযোগদ্বার সূত্র’ নামক গ্রন্থে ‘কনগসত্তরী’-র চর্চা রয়েছে |এই ‘কনগসত্তরী’-ই হিরণ্যসপ্ততি বা সুবর্ণসপ্ততি বা ‘সাংখ্যকারিকা’ নামে প্রসিদ্ধ |‘অনুযোগদ্বার সূত্র’-র রচনাকাল খ্রিস্টিয় প্রথম শতক |কাজেই ঈশ্বরকৃষ্ণের আবির্ভাবকাল ওই সময়ের আসেপাশে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতক |
·
সাংখ্যকারিকাতে ৭০টি কারিকা রয়েছে |কারিকাগুলি আর্যা ছন্দে রচিত |
·
সাংখ্যকারিকা-র অপর নাম – সাংখ্যসপ্ততি ,হিরণ্যসপ্ততি বা সুবর্ণসপ্ততি|
·
সাংখ্যকারিকা-র টীকা ও টীকাকার –
গৌড়পাদভাষ্য-গৌড়পাদাচার্য
মাঠরবৃত্তি-মাঠরাচার্য
জয়মঙ্গলা-শঙ্করাচার্য
সাংখ্যতত্ত্বকৌমুদী-বাচস্পতি মিশ্র
চন্দ্রিকা -নারায়ণচন্দ্র - ইত্যাদি |
·
সত্কার্যবাদ ও বহুপুরুষবাদ সাংখ্যদর্শনের প্রমুখ সিদ্ধান্ত |
·
সাংখ্যশাস্ত্রানুসারে আধ্যাত্মিক ,আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক ভেদে দুঃখ ত্রিবিধ |
·
সাংখ্যদর্শনে প্রত্যক্ষ ,অনুমান ও শব্দ ভেদে প্রমাণ ত্রিবিধ |
·
সাংখ্যদর্শন দ্বৈতবাদী দর্শন | যেহেতু এখানে পুরুষ ও প্রকৃতি এই দুটি তত্ত্ব স্বীকৃত হয়েছে |
সাংখ্যশাস্ত্রের অনুবন্ধচতুষ্টয়-
দুঃখত্রয়াভিঘাতাজ্জিজ্ঞাসা তদপঘাতকে হেতৌ ।
দৃষ্টে সাহপাৰ্থা চেন্নৈকান্তাত্যন্ততোঽভাবাৎ ৷৷ ১ ৷৷
অনুবাদ— ত্রিবিধি দুঃখের দ্বারা পীড়িত হওয়ায় দুঃখের বিনাশক উপায় সম্পর্কে ( শাস্ত্রপ্রতিপাদ্য বিষয়ে ) জিজ্ঞাসা হয় । লৌকিক উপায় বিদ্যমান থাকায় তা ( শাস্ত্রবিষয়ে জিজ্ঞাসা ) অর্থহীন এমন বলা যায় না । কারণ ( লৌকিক উপায়ের দ্বারা দুঃখের ) ঐকান্তিক ও আত্যন্তিক নিবৃত্তি হয় না ।
ত্রিবিধদুঃখের ঐকান্তিক এবং আত্যন্তিক নিবৃত্তিসাধনে লৌকিক উপায়ের ন্যায় বৈদিক উপায়ও ব্যর্থ কেন ?
দৃষ্টবদানুশ্রবিকঃ স হ্যবিশুদ্ধিক্ষয়াতিশয়যুক্তঃ ।
তদ্বিপরীতঃ শ্রেয়ান্ ব্যক্তাব্যক্তজ্ঞবিজ্ঞানাৎ ৷৷ ২ ৷৷
অনুবাদ— বৈদিক উপায় দৃষ্টতুল্য যেহেতু তা অবিশুদ্ধি , ক্ষয় এবং অতিশয়যুক্ত । বৈদিক উপায়ের বিপরীত যে উপায় — মহদাদি কাৰ্য্য , কারণ প্রকৃতি এবং জ্ঞানস্বরূপ পুরুষের বিবেকজ্ঞানস্বরূপ তা প্রশস্যতর ।
সাংখ্যশাস্ত্র প্রতিপাদ্যবিষয়সমূহের প্রকারভেদ-
মূলপ্রকৃতিরবিকৃতির্মহদাদ্যাঃ প্রকৃতিবিকৃতয়ঃ সপ্ত ।
ষোড়শকস্তু বিকারো না প্রকৃতির্ন বিকৃতিঃ পুরুষঃ ।। ৩ ।।
অনুবাদ— মূল কারণ কার্য্য নয় , মহদাদি সাতটি কারণ এবং কার্য্য । ষোলটি কার্য্যই ( কারণ নয় ) , পুরুষ কারণও নয় , কার্য্যও নয় ।
সাংখ্যদর্শনসম্মত প্রমাপ্রমাণতত্ত্ব-
দৃষ্টমনুমানমাপ্তবচনং চ সর্বপ্রমাণসিদ্ধত্বাৎ ।
ত্রিবিধং প্রমাণমিষ্টং প্রমেয়সিদ্ধিঃ প্রমাণাদ্ধি ॥ ৪ ৷
অনুবাদ – প্রত্যক্ষ অনুমান এবং শব্দভেদে তিন প্রকার প্রমাণ ( সাংখ্যাচার্য্যগণের ) অভিপ্রেত যেহেতু এতদতিরিক্ত ) সকল প্রমাণ এই ত্রিবিধপ্রমাণের অন্তর্গত । প্রমাণের দ্বারাই প্রমেয় সিদ্ধ হয় ।
প্রতিবিষয়াধ্যবসায়ো দৃষ্টং ত্রিবিধমনুমানমাখ্যাতম্ ।
তল্লিঙ্গলিঙ্গিপূর্বকমাপ্তশ্রুতিরাপ্তবচনস্তু ।। ৫ ।।
অনুবাদ – বিষয়েন্দ্রিয়সন্নিকর্ষজন্য নিশ্চয়াত্মক জ্ঞান প্রত্যক্ষ । ( শাস্ত্রাস্তরে ) বলা হয়েছে অনুমান তিনপ্রকার , তা ব্যাপ্যব্যাপকভাব ও পক্ষধর্মতাজ্ঞানপূর্বক হয় । অবাধিত বাক্যার্থজ্ঞান শব্দপ্রমাণ ।
সামান্যতস্তু দৃষ্টাদতীন্দ্রিয়ানাং প্রতীতিরনুমানাৎ|
তস্মাদপি চাসিদ্ধং পরোক্ষমাপ্তাগমাৎ সিদ্ধম্ ||৬||
অনুবাদ – সামান্যতো দৃষ্টো অনুমানের দ্বারা (এবং শেষবৎ অনুমানের দ্বারা ) অতীন্দ্রিয় পদার্থের জ্ঞান হয় |তার দ্বারাও অসিদ্ধ অতীন্দ্রিয় বিষয় আগমের দ্বারা সিদ্ধ হয় |
প্রত্যক্ষের প্রতিবন্ধক হেতুসমূহ-
অতিদূরাৎ সামীপ্যাদিন্দ্রিয়ঘাতান্মনোহনবস্থানাৎ ।
সৌক্ষ্ম্যাদ্ ব্যবধানাদভিভবাদ্ সমানাভিহারাচ্চ ৷৷ ৭ ৷৷
অনুবাদ — অতিদূরত্ব , অতিসামীপ্য , ইন্দ্রিয়বৈকল্য , অন্যমনস্কতা , সূক্ষ্মতা , ব্যবধান , অভিভব এবং সমানজাতীয় বস্তুর মিশ্রণের ফলে ` ( বিদ্যমান বস্তুর অনুপলব্ধি হয় ) ।
প্রকৃতির প্রত্যক্ষে প্রতিবন্ধক-
সৌক্ষ্ম্যাৎ তদনুপলব্ধির্নাভাবাৎ কাৰ্য্যতস্তদুপলব্ধেঃ ।
মহদাদি তচ্চ কার্যং প্রকৃতিসরূপং বিরূপঞ্চ ৷৷ ৮ ৷৷
অনুবাদ— যেহেতু কার্য্যের দ্বারা প্রকৃতির উপলব্ধি ( অনুমান ) হয় , সেহেতু প্রকৃতির অনুপলব্ধি হয় সূক্ষ্মতানিবন্ধন , অভাববশতঃ নয় । মহদাদি কার্য্য প্রকৃতির সমানধর্মবিশিষ্ট এবং বিরোধী ধর্মবিশিষ্ট হয় ।
সৎকার্য্যবাদ-
অসদকরণাদুপাদানগ্রহণাৎ সর্বসম্ভবাভাবাৎ ।
শক্তস্য শক্যকরণাৎ কারণভাবাচ্চ সৎ কাৰ্য্যম্ ।। ৯ ।।
অনুবাদ— কার্য্য ( কারণব্যাপারের পূর্বেও ) সৎ । হেতু হোল , অসতের উৎপত্তি হয় না , ( কার্য্যের সহিত ) কারণের সম্বন্ধ থাকে , সকল কারণ হতে সকল কার্যের উৎপত্তি হয় না , শক্তি বিশিষ্ট কারণের দ্বারা কার্য্য হয় , কার্য্য কারণাত্মক হয় ।
ব্যক্ত অব্যক্তের বৈধর্ম-
হেতুমদনিত্যমব্যাপি সক্রিয়মনেকমাশ্রিতং লিঙ্গম্ ।
সাবয়বং পরতন্ত্রং বিপরীতমব্যক্তম্ ৷৷ ১০ ৷৷
অনুবাদ— ব্যক্ত অর্থাৎ মহদাদি কার্য্যসমূহ কারণবিশিষ্ট , অনিত্য , পরিচ্ছিন্ন , ক্রিয়াশীল , অনেক , ( নিজকারণে ) আশ্রিত , প্রধানের অনুমাপক , সংযোগবিশিষ্ট , অন্যসাপেক্ষ । ( ব্যক্তের ) বিপরীত অব্যক্ত ।
ব্যক্ত অব্যক্তের সাধর্ম-
ত্রিগুণমবিবেকি বিষয়ঃ সামান্যমচেতনং প্রসবধর্মি ।
ব্যক্তং তথা প্রধানং তদ্বিপরীতস্তথা চ পুমান্ ।। ১১ ।।
অনুবাদ – মহদাদি কাৰ্য্য এবং প্রকৃতি ত্রিগুণাত্মক , মিলিত হয়ে কার্য সম্পাদন করে , জ্ঞেয় , বহুগ্রাহ্য , অচেতন , পরিবর্তনশীল ; পুরুষ তদ্বিপরীত এবং তদ্রূপ ।
গুণত্রয়ের স্বরূপ , প্রয়োজন ও ক্রিয়া-
প্রীত্যপ্রীতিবিষাদাত্মকাঃ প্রকাশ প্রবৃত্তিনিয়মার্থাঃ ।
অন্যোঽন্যাভিভবাশ্রয়জননমিথুনবৃত্তয়শ্চ গুণাঃ ।। ১২ ৷৷
অনুবাদ— গুণসমূহ সুখদুঃখমোহাত্মক , ( গুণসমূহের ) প্রয়োজন প্রকাশ , প্রবৃত্তি এবং নিয়ন্ত্রণ , ( গুণত্রয় ) একে অন্যকে অভিভূত করে ক্রিয়াশীল হয় । একে অন্যের সহকারিতায় ক্রিয়াশীল হয় , পারস্পরিক সহকারিতায় সরূপ ও বিরূপ পরিণামপ্রাপ্ত হয় , একে অন্যকে কখনই পরিত্যাগ করে না ।
গুণত্রয়ের স্বরূপ প্রয়োজন ও ক্রিয়া-
সত্ত্বং লঘু প্রকাশ কমিষ্টমুপষ্টম্বকং চলঞ্চ রজঃ ।
গুরুবরণকমের তমঃ প্রতীপবচ্চার্থতো বৃত্তি ।। ১৩ ।।
অনুবাদ - সাংখ্যাচার্যগণের অভিপ্রেত হোল সগুণ লঘু এবং প্রকাশক , রজোগুণ ক্রিয়াশীল এবং ( অপর দুই গুণের ) প্রবর্ত্তক , তমোগুণ গুরুত্ব বিশিষ্ট এবং আবরক প্রদীপের মতো পুরুষার্থের জন্য এককার্য্যকারী হয় ।
অব্যক্তসিদ্ধ-
অবিবেক্যাদেঃ সিদ্ধিস্রৈগুণ্যাত্ তদ্বিপর্যয়াভাবাং ।
কারণগুণাত্মকত্বাৎ কার্য্যস্যাব্যক্তমপি সিদ্ধম্ ৷৷ ১৪ ৷৷
অনুবাদ— ত্রৈগুণাবশতঃ অবিবেকিত্ব প্রভৃতি সিদ্ধ হয় । অবিবেকিত্বাদির অভাবে ত্রৈগুণ্যাভাব হয় । কার্য্য যেহেতু কারণগুণাত্মক হয় সেহেতু অব্যক্তও সিদ্ধ হয় ।
অব্যক্তসিদ্ধি-
ভেদানাং পরিমাণাৎ সমন্বয়াচ্ছক্তিতঃ প্রবৃত্তেশ্চ ।
কারণকার্য্যবিভাগাদবিভাগাদ্ বৈশ্বরূপ্যস্য ।। ১৫ ৷৷
অনুবাদ— কাৰ্য্যসমূহ যেহেতু পরিচ্ছিন্ন , সুখদুঃখমোহাত্মক , যেহেতু ( কারণের ) শক্তি হতে কাৰ্য্য উৎপন্ন হয় , যেহেতু কারণ হতে কার্য্যের অভিব্যক্তি হয় , যেহেতু কার্য্যসমূহের কারণে লয়প্রাপ্তি ঘটে ( সেহেতু অব্যক্ত কারণ আছে ) ।
No comments:
Post a Comment