MU,PG, SEM-III,DSE-DA-3.4
প্রশস্তপাদভাষ্যোক্ত মঙ্গলাচরণ শ্লোকের ব্যাখ্যা ও অনুবন্ধ চতুষ্টয় নিরুপণ
বৈশেষিক প্রস্থানের কণাদ সূত্রের পরবর্তী গ্রন্থ হল ‘পদার্থধর্মসংগ্রহ’।
আচার্য প্রশস্তপাদ কৃত এই গ্রন্থ বৈশেষিক সূত্রের উপর ভাষ্যস্থানীয় গ্রন্থ এবং 'প্রশস্তপাদভাষ্য' নামে সমধিক পরিচিত। এই গ্রন্থ পণ্ডিত সমাজে কণাদসূত্রের থেকেও বেশী প্রামাণিক
গ্রন্থ বলে বিবেচিত হয়েছে।
নির্বিঘ্নে গ্রন্থের সমাপ্তিকল্পে গ্রন্থারম্ভে মঙ্গলাচরণ অতি প্রাচীন ভারতীয়
রীতি। বৈশেষিক সূত্রগ্রন্থে বা কণাদসূত্রে মঙ্গলাচরণের উল্লেখ বা আলোচনা সচরাচর
পরিলক্ষিত হয় না তবে প্রশস্তপাদভাষ্য, কিরণাবলী, তর্কসংগ্রহ, ভাষাপরিচ্ছেদ প্রভৃতি বা এক কথায় প্রশস্তপাদভাষ্যের পরবর্তী
প্রায় সকল বৈশেষিক আচার্যদের গ্রন্থারম্ভে মঙ্গলাচরণ বিশেষ যত্ন সহকারে ও
বিস্তারিতভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। আমরা এখানে প্রশস্তপাদভাষ্য কৃত মঙ্গলাচরণের
সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে সাধারণভাবে মঙ্গলাচরণের প্রয়োজন ও ফলাফল সম্পর্কে বৈশেষিকাচার্যদের
মতামত উপস্থাপন করব।
প্রশস্তপাদভাষ্যোক্ত মঙ্গলাচরণ
প্রশস্তপাদভাষ্যের প্রারম্ভে আচার্য প্রশস্তদেব নির্বিঘ্নে গ্রন্থের
সমাপ্তিকল্পে ইষ্টদেবের উদ্দেশ্যে মঙ্গলাচরণ করে বলেছেন -
"প্রণম্য হেতুমীশ্বরং মুনিং কণাদমন্বতঃ।
পদার্থধৰ্ম্মসংগ্রহঃ প্রবক্ষ্যতে মহোদয়ঃ।।"
অর্থাৎ জগৎ-কারণ ঈশ্বরকে এবং তারপর (অতঃ অনু) কণাদমুনিকে প্রণাম জানিয়ে তত্ত্বজ্ঞানের জনক (মহোদয়ঃ) পদার্থধর্মসংগ্রহ গ্রন্থ কথিত হচ্ছে।
'প্রণাম' বলতে প্রকৃষ্ট নমস্কারকে বোঝান হয়। ভক্তি-শ্রদ্ধাপূর্বক যে নমস্কার তাই
প্রকৃষ্ট নমস্কার। ঈশ্বর ও কণাদ মুনিকে প্রকৃষ্ট নমস্কার করা হল এই কারণে যে এর
দ্বারা বাঞ্ছিত লক্ষ্যের পক্ষে বিঘ্ন থাকলে তা নাশ হবে এবং বাঞ্ছিত ফল লাভ হবে।
ঈশ্বরের বিশেষণে বলা হয়েছে ‘হেতু’। 'হেতু' শব্দের অর্থ কারণ। ঈশ্বর একাধারে জগতের এবং কণাদ মুনির
বৈশেষিক সূত্র গ্রন্থের নিমিত্ত কারণ। তাঁরই ইচ্ছায় জগৎ সৃষ্ট হয়েছে এবং তাঁরই ইচ্ছায় কণাদ মুনি কর্তৃক বৈশেষিক সূত্র রচিত হয়েছে। পদার্থধর্মসংগ্রহ গ্রন্থ বৈশেষিক সূত্র-নির্ভর। বৈশেষিক সূত্র রচিত না হলে এই শাস্ত্র রচিত হতে পারত না। তাই
বৈশেষিক সূত্রের রচয়িতাকেও প্রশস্তপাদাচার্য নমস্কার জানালেন।
পদার্থধর্মসংগ্রহ গ্রন্থে বৈশেষিক সম্মত পদার্থ তত্ত্ব ও তাদের সাধর্ম –বৈধর্ম
আলোচিত হয়েছে। এই কারণেই গ্রন্থের নাম
হয়েছে পদার্থধর্মসংগ্রহ। এই গ্রন্থ পাঠ করলে পদার্থ তত্ত্বের সম্যক্ বোধের উদয়
হবে। বৈশেষিক সূত্রকার কণাদ দ্রব্য, গুণ,
কর্ম, সামান্য, বিশেষ ও সমবায় ভাবপদার্থের তালিকায় এই ছয়টি ভাবপদার্থের
উল্লেখ করেছেন। প্রশস্তপাদাচার্যও সেইমত ছয়টি ভাবপদার্থের উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী
বৈশেষিকাচার্যগণ অভাবকেও পদার্থতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সুতরাং বৈশেষিক সম্মত
সপ্তপদার্থ ও তাদের সাধর্ম ও বৈধর্মের সম্যক্
বোধই হল তত্ত্বজ্ঞান। এইরূপ তত্ত্বজ্ঞানকেই গ্রন্থকার 'মহোদয়' শব্দের দ্বারা বুঝিয়েছেন।
'মহোদয়' শব্দের অর্থ মহান
উদয়। যার উদয়ে মহান বস্তু লাভ হয় তাই মহান উদয়। বৈশেষিকমতে পদার্থের তত্ত্বজ্ঞানই
মোক্ষোপসাধক। তাই গ্রন্থকার পদার্থসমূহের সাধর্ম ও বৈধর্মের তত্ত্বজ্ঞানকেই মহোদয়
বলেছেন। যার দ্বারা মোক্ষ বা অপবর্গরূপ মুক্তি লাভ হয় তাই মহোদয়।
প্রশস্তপাদাচার্যের মতে মহোদয় হ'ল মোক্ষের
হেতু। পরবর্তী ভাষ্যে তিনি আরো স্পষ্ট ভাষায় তা ব্যক্ত করতে বলেছেন দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ ও সমবায় এই
ছয়টি পদার্থের সাধর্ম ও বৈধর্মের তত্ত্বজ্ঞান
নিঃশ্রেয়সের হেতু।
প্রশ্ন উঠতে পারে পদার্থধর্মসংগ্রহ গ্রন্থের সঙ্গে নিঃশ্রেয়সের সম্বন্ধ কিরূপ।
এর উত্তরে বলতে হয়, গ্রন্থের সঙ্গে
নিঃশ্রেয়সের প্রযোজ্য-প্রযোজক সম্বন্ধ। গ্রন্থ সাক্ষাৎ মোক্ষের হেতু হতে পারে না, তবে গ্রন্থ পাঠ
করলে পাদর্থসমূহের সাধর্ম ও বৈধর্মের যে
তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয় সেই তত্ত্বজ্ঞান মোক্ষের হেতু। তত্ত্বজ্ঞান লাভ হলে
মিথ্যাজ্ঞান বিনষ্ট হয়, মিথ্যাজ্ঞান বিনষ্ট
হলে প্রবৃত্তি, দোষ, জন্ম ও দুঃখ পরম্পরাক্রমে বিনষ্ট হয়। দুঃখের আত্যন্তিক বিনাশই যেহেতু
বৈশেষিকমতে মোক্ষ সেহেতু মোক্ষলাভের প্রতি উক্ত শাস্ত্র পরম্পরাক্রমে হেতু বলে
গৃহীত হয়।
অনুবন্ধচতুষ্টয় নিরুপণ
শাস্ত্র বা গ্রন্থের আরম্ভে অনুবন্ধের নির্দেশ মঙ্গলাচরণের ন্যায় অবশ্যকর্তব্য
রূপে প্রাচীনকালে বিবেচিত হত । ‘অনুবধ্নন্তি স্বজ্ঞানেন প্রেরয়ন্তি শাস্ত্রে
কর্মণি বা প্রেক্ষাবৎ পুরুষং প্রবর্তয়ন্তি যে তে অনুবন্ধাঃ পুরুষপ্রবৃত্তিহেতবঃ
ইত্যর্থঃ’ –অর্থাৎ যারা নিজেদের জ্ঞান জন্মিয়ে প্রেক্ষাবান্ পুরুষকে কোনো
শাস্ত্র বা গ্রন্থ-পাঠে প্রবৃত্ত করে তারাই অনুবন্ধ। গ্রন্থের শুরুতেই এদের উল্লেখ
কর্তব্য । আমাদের আলোচ্য মঙ্গলাচরণ শ্লোকের মাধ্যমে প্রেক্ষাবান্ পুরুষকে
বৈশেষিক প্রস্থানের গ্রন্থ-পাঠে প্রবৃত্তি হেতু প্রশস্তপাদাচার্য নিম্নোক্তভাবে অনুবন্ধ
চতুষ্টয়ের উল্লেখ করেছেন-
1. পদার্থধর্মসংগ্রহ এই পদের দ্বারা দ্রব্যাদি ষট্ পদার্থ অভিধেয়
অর্থাৎ বিষয় ,
2. গ্রন্থ তথা দ্রব্যাদি পদার্থের বাচ্য-বাচক ভাব.এবং তাদের
জ্ঞানে মহোদয়ের সাথে সাধ্য-সাধনভাবরূপ-ই সম্বন্ধ ,
3. পদার্থ তথা ধর্মের তত্ত্বজ্ঞানদ্বারা নিঃশ্রেয়সাকাঙ্ক্ষী অধিকারী,
4. মহোদয় পদে তত্ত্বজ্ঞান
রূপ প্রয়োজন সূচিত হয়েছে ।
No comments:
Post a Comment