SANS-H-CC-T-03
বাণস্য রচনাশৈলী -বিষয়ে প্রবন্ধঃ
ভূমিকাঃ-
সংস্কৃত সাহিত্যে বৈদর্ভী, গৌড়ী, পাঞ্চালী ইত্যাদি কয়েকটি রচনারীতি প্রচলিত ছিল । এই রীতিসমূহ হল কাব্যের প্রাণ । তাই আচার্য বামন বলেছেন—‘রীতিরাত্মা কাব্যস্য ।‘ কবির সহজাত প্রতিভার সঙ্গে তাঁর বর্ণনীয় বিষয় এবং যুগধর্মের প্রভাবে এই রচনারীতি নির্ধারিত হয় । এই সম্বন্ধে জনৈক পাশ্চাত্ত্য সমালোচক বলেছেন—‘All literature implies style, for style is the reflection of writer’s personality which is again determined by the age in which he lives.’
এই personality থেকেই লেখকের style অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। বাণভট্টও তার ব্যতিক্রম নন।
রচনারীতি সম্বন্ধে বাণের নিজস্ব মত—
বাণের রচনারীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাহিত্য সম্বন্ধে তাঁর নিজস্ব ধারণা। সেগুলি বিশ্লেষণ না করলে তাঁর রচনারীতি সম্বন্ধে পরিপূর্ণ ধারণা পাওয়া সম্ভব নয় । বাণ তাঁর হর্ষচরিত কাব্যের প্রথম উচ্ছ্বাসে তৎকালে প্রচলিত চারটি প্রধান কাব্যধারার উল্লেখ করেছেন—
‘শ্লেষপ্রায়মুদীচ্যেষু প্রতীচ্যেষ্বর্থমাত্রকম্।
উৎপ্রেক্ষা দাক্ষিণাত্যেষু গৌড়েষ্বক্ষরডম্বরম্ ।।'
--উদীচ্য কবিদের রচনায় শ্লেষের প্রাধান্য, প্রতীচ্য কবিদের ঝোঁক অর্থবাহুল্যের দিকে, দাক্ষিণাত্যের কবিদের কাব্যে উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কারের প্রাধান্য এবং গৌড়দেশীয়রা শব্দাড়ম্বরপ্রিয়।
এই চারটি রচনারীতি স্বতন্ত্রভাবে দোষযুক্ত। তাই একটি আদর্শ রচনারীতির স্বরূপ কেমন হবে সেই সম্বন্ধে বাণ বলেছেন—
‘নবোঽর্থো জাতিরগ্রাম্যা শ্লেষোঽক্লিষ্টঃ স্ফুটো রসঃ।
বিকটাক্ষরবন্ধশ্চ কৃত্স্নমেকত্র দুষ্করম্ ।।'
অভিনব বিষয়, গ্রাম্যতা দোষবর্জিত বস্তুর যথাবদ্ বর্ণনা, সহজবোধ্য শ্লেষ, সুব্যক্ত রস এবং ওজস্বী শব্দবন্ধ –এই সমস্ত ব্যাপার কোন রচনায় থাকলে তা হবে আদর্শ রচনা ।
বাণ আরও বলেছেন—যে কবির কাব্য সমস্ত বৃত্তান্ত ব্যাপ্ত করে মহাভারতের মতো সর্ববৃত্তান্তগামিনী কথার মতো প্রকাশিত না হয়, সে কবি ও তাঁর কাব্যের কোন প্রয়োজন নেই।
রচনারীতির বৈশিষ্ট্য—
দীর্ঘায়িত বর্ণনা—
বাণ যখন যা বর্ণনা করেছেন তখন তা নিঃশেষে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করেছেন। ফলে তাঁর অধিকাংশ বর্ণনাই হয়েছে দীর্ঘ বিস্তৃত । যেমন—কাদম্বরীকথামুখে বর্ণিত চণ্ডালকন্যা । কবিকল্পনার ব্যাপ্তি ও গভীরতায় চণ্ডালকন্যা স্বর্গের সৌন্দর্য ও মর্ত্যের আকাঙ্ক্ষার যুগল মূর্তিরূপে বর্ণিত হয়েছে । এইরকম রাজা শূদ্রক, বিন্ধ্যাটবী, শাল্মলী তরু, পম্পাসরোবর, বৃদ্ধ তপস্বী জাবালি, মৃগয়ার কোলাহল, জাবালির আশ্রম প্রভৃতি । বর্ণনার বাহুল্যে কোন কোন সময় মুখ্য কাহিনী গৌণ কাহিনীর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে ।
সমাসবাহুল্য ও ওজোগুণের প্রাধান্য—
রচনার মধ্যে দীর্ঘ সমাসের ব্যবহার প্রচুর । ওজোগুণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে এই সমাস । এই দুটি গদ্যকাব্যের প্রাণস্বরূপ—‘ওজঃ সমাসভূয়স্ত্বমেতদ্ গদ্যস্য জীবিতম্ ।‘
চিত্রকল্প—
বাণ অসাধারণ কিছু চিত্রকল্প সৃষ্টি করেছেন । কাদম্বরীকথামুখে নবোদিত সূর্যের আরক্তিম আভা, দীপ্ত ও রমণীয়রূপে চণ্ডালকন্যা, জীর্ণ-বৃদ্ধ শাল্মলী তরু, মৃগয়ার চিত্র, ভয়ঙ্কর-দর্শন বৃদ্ধ শবর, কঠোর তপশ্চারী, তেজস্বী ও করুণার প্রতিমূর্তি বৃদ্ধ তপস্বী জাবালি, অস্তগামী সূর্য প্রভৃতি প্রতিটি চিত্রই কবি-কল্পনার দীপ্তিতে উজ্জ্বল।
ভাব অনুসারে ভাষার প্রয়োগ—
বাণ ভাব ও ভাষার মধ্যে অপূর্ব সামঞ্জস্যবিধান করেছেন। চণ্ডালকন্যার মর্ত্যলোক-দুর্লভ সৌন্দর্য, বিন্ধ্যাটবীর স্নিগ্ধ-কোমল সৌন্দর্য ও মৃত্যুর বিভীষিকা বিমূর্ত উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও দীর্ঘ সমাসবহুল বাক্যে বিবৃত হয়েছে। এইরকম শাল্মলী তরু, মুনিকুমার হারীত, শবর সেনাপতি প্রভৃতি সমস্ত বর্ণনাতেই বিষয় অনুসারে ভাষার প্রয়োগ করা হয়েছে।
বাণ যখন মানুষের হৃদয়বৃত্তির কথা বলেছেন, তখন সেই সেই ভাবাশ্রয়ী ভাষাও ব্যবহার করেছেন। যেমন—হর্ষচরিতের প্রথম উচ্ছ্বাসে ঋষি দুর্বাসাকে ব্রহ্মার উপদেশ ও তিরস্কার, পঞ্চম উচ্ছ্বাসে প্রভাকরবর্ধন কর্তৃক হর্ষকে সান্ত্বনাদান, কাদম্বরীতে পুণ্ডরীকের মৃত্যুতে কপিঞ্জলের আর্তনাদ, মহাশ্বেতার বিলাপ, চন্দ্রাপীড়কে শুকনাসের উপদেশ প্রভৃতি ছোট ছোট বাক্যে সমাপ্ত হয়েছে । রাজলক্ষ্মীর নিষ্ঠুর স্বভাব সম্বন্ধে শুকনাস বলেছেন— ‘ন পরিচয়ং রক্ষতি, নাভিজনমীক্ষতে, ন রূপমালোকয়তে। ন কুলক্রমমনুবর্ততে, ন শীলং পশ্যতি, ন বৈদ্গ্ধ্যং গণয়তি, ন শ্রুতমাকর্ণয়তি। ধর্মনুরুধ্যতে, ন ত্যাগমাদ্রিয়তে, ন বিশেষজ্ঞতাং বিচারয়তি ।'
আন্তরবস্তুর বিশ্লেষণ—
বাণ মানুষের অন্তর্নিহিত সূক্ষ্ম, কোমল ও সংবেদনশীল আবেগ-অনুভূতি সুদক্ষ মনস্তাত্ত্বিকের মতো তুলে ধরেছেন । যেমন—পিতার মৃত্যুর পর শুকশাবকের মানসিক অবস্থা— ‘নাস্তি জীবিতাদন্যদভিমততরমিহ জগতি সর্বজন্তূনাম্ । ধিঙ্ মামকরুণমতিনিষ্ঠুরম্’ ।সন্তানহীন পিতা তারাপীড়ের মানসিক অবস্থা, মহাশ্বেতার হৃদয়ের তন্ময়তা, আত্মনিবেদন প্রভৃতি তাদের আত্মবিশ্লেষণে যথাযথভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রথাবহির্ভূত উপমা-প্রয়োগ—
বাণ প্রথাবহির্ভূত উপমা-প্রয়োগে একেবারে আধুনিক । যেমন—কাদম্বরীতে প্রভাককালের চাঁদ—‘কমলিনী-মধুরক্ত-পক্ষসম্পূটে বৃদ্ধহংস ইব—চন্দ্রমসি ।‘
অস্তগামী সূর্য—‘পারাবত-পাদ-পাটলরাগো রবিঃ’--পায়রার পায়ের মতো রক্তিম সূর্য । ইন্দ্রিয়াসক্তরাজাদের স্বভাব—‘কুলীরা ইব তির্যক্ পরিভ্রমন্তি’ –কাঁকড়ার মতো তির্যকভাবে চলেন।অপরাহ্ণকালের রোদ—‘বালবাসস্যারুণ অপরাহ্ণতাপে’-বাচ্চা কাকের মুখের মতো অরুণবর্ণ ।
সন্ধ্যার অন্ধকার—‘পরিণমত্ তালফলত্বিট্’--পাকছে এমন তালফলের মতো কালচে বাদামি ।
এইরকম আরও অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে ।বাণ কোথাও কোথাও বিশেষণ প্রয়োগে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন।
উপসংহার—
বাণের দীর্ঘ বিস্তারিত বর্ণনা, ওজোগুণ-প্রধান সমাস-বহুল রচনারীতি কোন কোন সমালোচকের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। যেমন পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিত Weber বলেছেন— ‘Bana’s prose is an Indian wood where progress is rendered impossible--'. Dr. S. N. Dasgupta বলেছেন—His choice of subject may be good, but his choice of scale is fatal.’ এইরকম বিরুদ্ধ সমালোচনা থাকলেও বাণের কাব্যের উপাদেয়তা অস্বীকার করা যায় না। রঙের সূক্ষ্ম ব্যবহারে চিত্রনির্মাণে, প্রথাভির্ভূত উপমা-প্রয়োগে, বিশেষণের অতিরিক্ত ব্যঞ্জনাসৃষ্টিতে, সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি ও গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তিতে বাণ যা সৃষ্টি করেছেন তা এককথায় অতুলনীয়। সাহিত্যে এমন কোন ভাব নেই যা বাণভট্ট পরিস্ফুট করেন নি । সেইজন্যই বলা হয়— ‘বাণোচ্ছ্বিষ্টং জগত্সর্বম্ ।‘ বাণের লেখনীর অনায়াস চলনকে লক্ষ্য করে রাজশেখর বলেছেন— ‘বাণস্য বাণ্যনার্যেব স্বচ্ছন্দা ভ্রমটি ক্ষিতৌ’ ।‘ জনৈক সমালোচক যে বলেছিলেন ‘কাদম্বরী রসজ্ঞানামাহারোঽপি ন রোচতে’ তা অত্যুক্তি নয়, রসজ্ঞের বিচার ।
-------------
No comments:
Post a Comment